22/02/2025
‘বোরড’ হলে যা করতে পারেন
আমরা প্রতিদিন একইরকম প্রডাক্টিভ থাকি না। মাঝে মাঝে অন্যান্য দিনের চেয়ে ধীরগতিতে কাজ আগায়, কখনও কখনও একদমই কিছু করতে ভাল লাগে না। তখন নিজেকে জোর করে কাজে বসালেও ফলাফল থাকে শূন্য।
এরকম সময়গুলিতে কী করবেন? বার বার নিয়মিত কাজগুলি করারই চেষ্টা চালিয়ে যাবেন নাকি অভিনব কিছু করার চেষ্টা করে দেখবেন? আর বোরড হওয়া কি আমাদের জন্য নেতিবাচক?
উত্তরটা হচ্ছে, একদমই না। বরং বোরড হওয়া কখনও কখনও সুফল বয়ে আনতে পারে আমাদের জন্য। এরকম সময়গুলিতেই সৃজনশীল আইডিয়া তৈরি হতে পারে।
ইতালিতে একটি প্রবাদ আছে, যার অর্থ হল “কোনো কিছু না করার আনন্দ”। এখানে বিশ্রামকে প্রাধান্য দেওয়া মূল বিষয়। কোনো কিছু না করার মাধ্যমেও শান্তি পাওয়া যেতে পারে। যখন আপনি উপলব্ধি করবেন, কিছু না করা আর সময় অপচয় করা এক নয়। কখনও কখনও কিছু না করেও সময় কাটানো প্রয়োজন আমাদের, মানসিক বিশ্রামের জন্য।
আমরা অবিরত চলাফেরা করে অভ্যস্ত, একঘেঁয়েমি আমাদের একটু স্থির হতে সাহায্য করে। তবে, একঘেয়েমি কেউ কেউ একেবারেই চান না। তাদের জন্য এই লেখায় থাকছে বিশেষ কিছু টিপস।
একঘেঁয়ে সময়ে এই কাজগুলি করে জীবনে আনন্দ ফিরিয়ে আনতে পারেন।
১. ঘর গোছান
ঘর গোছানো, অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে রাখা বা ফেলে দেওয়া অর্থাৎ ডিক্লাটার করার মাধ্যমে ঘরে নতুন লুক ও নান্দনিকতা নিয়ে আসতে পারেন। আমাদের ভেতরের পৃথিবীটা দেখতে কেমন, তার প্রতিফলন ঘরের নান্দনিকতায় দেখা যায়।
এক্ষেত্রে উল্টাটাও ঠিক। আমাদের ভেতরের বিশৃঙ্খলাকে একঘেঁয়েমি বলে মনে হতে পারে, তবে বাইরের পরিবেশ অগোছালো ও বিশৃঙ্খল হলে আমাদের ফলপ্রসূতা কমে যেতে পারে, ফলে একঘেঁয়েমি অনুভূত হতে পারে।
ফলপ্রসূতা বাড়ানোর জন্য আমরা ‘বাইরের পৃথিবী’কে একটু গুছিয়ে রাখতে পারি। নিজের থাকার জায়গাটুকুতে নতুনত্ব আনছেন, সতেজ করে তুলছেন, আপনাকে আনন্দ দেয় এমন বিভিন্ন জিনিস নিয়ে আসছেন, ফার্নিচার সরিয়ে নতুন জায়গায় নিচ্ছেন। এতে ফলপ্রসূ অনুভব করবেন।
২. বই পড়ুন
বইপড়া যেমন আনন্দ দেয়, তেমনি এর সুবিধাও আছে। এটি আমাদের স্মৃতিশক্তি, সহানুভূতি বাড়াতে পারে এবং আমাদের আশাবাদী হতে সাহায্য করে।
আমাদের মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও বইপড়া অত্যন্ত উপকারি। বই পড়লে আমাদের স্নায়ু শক্তিশালী হয়, মস্তিষ্ক স্থিতিস্থাপক ও সক্রিয় থাকে। এছাড়া এর ফলে মানসিক চাপ কমে, তাই বইপড়া স্বাস্থ্যের জন্যও ভাল।
গল্প উপন্যাসই পড়তে হবে এমন কোনো কথা নেই। কমিকও পড়তে পারেন চাইলে, একাডেমিক আর্টিকেল অথবা ভাল কোনো ব্লগ পোস্ট পড়ুন।
৩. কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের পরিকল্পনা করুন
আগে থেকেই নানারকম কাজের পরিকল্পনা করা একঘেঁয়েমি কমাতে পারে। অফিসে কঠিন সময় আসার আগে সব কিছু গুছিয়ে ফেলা ভাল। আগে থেকে কাজের পরিকল্পনা করা খুব একটা রোমাঞ্চকর কাজ না, তবে একঘেঁয়ে সময় কাটানোর দারুণ একটি উপায় এটি।
৪. নতুন কোনো স্কিল শিখুন
আপনার পেশা যাই হোক, ব্যক্তিগত ও পেশাদার বিকাশের সুযোগ সবসময় থাকে। হার্ড স্কিল, সফট স্কিল, লাইফ হ্যাক, সবসময়ই কিছু না কিছু শেখার সুযোগ থাকে।
বর্তমানে ডিজিটাল স্কিলের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। এই স্কিলগুলি আপনার জীবনকেই শুধু সহজ করবে না, অফিসেও কাজে লাগবে। আপনি উদ্যোক্তা হন বা ডাক্তার, বিজনেসের প্রচার ও নিজস্ব চিন্তাভাবনা প্রকাশে একটি ওয়েবসাইট থাকা অত্যন্ত দরকার। কীভাবে ওয়েবসাইট বানাতে হয় ও তা পরিচালনা করতে হয় তা জানা থাকলে অনেক টাকা বাঁচাতে পারবেন।
এছাড়াও সফট স্কিল শিখলে জীবনে অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারবেন। দরকারি সফট স্কিলের মধ্যে আছে কমিউনিকেশন, টাইম ম্যানেজমেন্ট, সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা ও নেতৃত্বের গুণাবলি।
৫. সিভি আপডেট করুন
কখন সিভি আপডেট করেন? নিয়মিত নাকি কয়েক মাস বা বছর পর? নাকি যখন কোথাও পাঠাতে হয় তখন? ধরে নিচ্ছি, শেষ অপশনটিই আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
একটা বিষয়ে আমরা সবাই একমত হব, সিভি লেখা অত্যন্ত বোরিং কাজ। আপনি যদি ইতোমধ্যে বোরড বা একঘেঁয়ে অনুভব করে থাকেন, তাহলে সিভিটা নিয়ে বসুন। ছবি পরিবর্তন করুন, নতুন দক্ষতা যোগ করুন, প্রয়োজন নেই এমন অভিজ্ঞতা ডিলিট করুন।
৬. এক্সারসাইজ করুন
একঘেঁয়ে অনুভূত হওয়ার পেছনে নানারকম কারণ থাকতে পারে। অ্যাংজাইটি, ভয়, কিংবা করার মত কোনো কাজ না থাকা। একঘেঁয়েমির পেছনে কারণ যাই হোক, ইয়োগা বা অন্যান্য এক্সারসাইজের মাধ্যমে আপনি মনকে সতেজ করতে পারবেন ও নিজের প্রতি আরও মনোযোগী হতে পারবেন।
এক্সারসাইজের নানারকম সুবিধা আছে। নানারকম পোজের চর্চা আপনার শরীরকে শক্তিশালী করবে, স্ট্রেচিং এ সাহায্য করবে। এর ফলে একঘেঁয়েমি কমবে, মানসিক চাপ কমবে ও আপনিও শেইপে থাকবেন।
৭. মস্তিষ্কের ব্যায়াম করুন
ছোটবেলায় নতুন কোনো স্কিল শেখা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল মনে আছে? হিসাব করা, জ্যামিতি, ব্যাকরণ, নামতা, ধাঁধা ইত্যাদি সবকিছু আমাদের মস্তিষ্কের জন্য ব্যায়াম ছিল। এর ফলে আমাদের মস্তিষ্ক তাড়াতাড়ি কাজ করতে শিখত।
তবে আমরা যত বড় হই, এসব কাজের বেশিরভাগই আর করি না। বরং অন্যান্য পরিচিত কাজ সম্পর্কিত বিষয়ে বেশি মনোযোগ দেই। হাতে অবসর সময় থাকলে, মস্তিষ্ককে একটু ব্যায়াম করিয়ে নিতে পারেন।
কগনিটিভ বিশেষজ্ঞরা কিছু বিষয়ে একমত হয়েছেন: এই ব্যায়ামগুলির কোনো ক্ষতিকর প্রভাব নেই, এতে আমাদের মস্তিষ্ক প্রসারিত হয়, এগুলি করে আনন্দ পাওয়া যায় ও এগুলি নতুন স্নায়বিক পথ তৈরিতে সাহায্য করে। এগুলি কি আপনাকে সুপার-হিউম্যান হয়ে উঠতে সাহায্য করবে? সম্ভবত না, তবে স্পষ্টভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করবে।
মস্তিষ্কের ব্যায়ামের ক্ষেত্রে এই কাজগুলি করতে পারেন:
• আপনার শহর বা পাড়ার একটি মানচিত্র আঁকুন। এক্ষেত্রে একটি পাখির দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো এলাকার মানচিত্র আঁকার চেষ্টা করুন।
• নন-ডমিন্যান্ট বা উল্টো হাত ব্যবহার করার চেষ্টা করুন। মাউজ ব্যবহার করা, খাওয়া কিংবা লেখার মত সহজ কাজগুলি উল্টো হাতে করতে গেলে বেশ কঠিন মনে হয়। তবে এতে স্নায়বিক সংযোগ আরও শক্তিশালী হয় ও নতুন স্নায়ু তৈরিতে সাহায্য করে।
• মস্তিষ্কের খেলা: এ ধরনের খেলাগুলি আপনার স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, যৌক্তিক দক্ষতা ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা বাড়াবে। সুডোকু খেলুন, কাগজে বা অনলাইনে। এছাড়া লুমোসিটি, ক্রসওয়ার্ড ও হ্যাপি নিউরন গেমসও খেলতে পারেন।
৮. নিজের যত্ন নিন
অনেকের ক্ষেত্রেই নিজের যত্ন নেওয়া অনেক কম অগ্রাধিকার পায়। এমনকি অনেক সময় নিজের যত্ন নিয়ে সময় কাটালে আমাদের অনুতাপ বোধ হয়। এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হলে নিজেকে ও নিজের সুস্থতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
নিজের যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে ফলপ্রসূতা বাড়ে। আমরা যখন একঘেঁয়ে অনুভব করি, তখন নিজের নানারকম ভুল ত্রুটি খুঁজে বের করার প্রবণতা বাড়ে। আমরা কেন আরও ফলপ্রসূ ভাবে সময় কাটাচ্ছি না তা নিয়ে নিজেদের জাজ করি। এ রকম সময়ে, সেলফ-কেয়ার এ ধরনের মনোভাব পরিবর্তন করতে পারে।
কিন্তু নিজের যত্ন কীভাবে নিতে হবে? কী করতে হবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তরে এই টিপসগুলি দেখে নিতে পারেন:
• একটি গ্র্যাটিটিউড জার্নাল বানান: জীবনের কোন বিষয়গুলি নিয়ে আপনি কৃতজ্ঞ তাই এখানে লিখবেন
• আপনাকে আনন্দ দেবে এমন কোনো কাজ করুন
• ভাল ও স্বাস্থ্যকর কোনো খাবার বানান
• পরিবার ও বন্ধুদের সাথে সময় কাটান
৯. কাউকে সাহায্য করুন
নিজের চারদিকের মানুষদের দিকে তাকান। অফিসের সহকর্মী, ভাল বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এমন কাউকে পাবেন, যার এই মুহূর্তে সাহায্যের দরকার। তাদের পাশে দাঁড়ান, সাথে থাকুন।
১০. পছন্দের পণ্যের রিভিউ লিখুন
সম্প্রতি কিনেছেন এমন অসাধারণ পণ্যের বা ভাল কাস্টমার সার্ভিসের ইতিবাচক রিভিউ লেখার মাধ্যমে আপনি কোম্পানির কর্মী ও সংশ্লিষ্টদের ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখতে পারেন।
হতে পারে নতুন কোনো উদ্যোক্তার কাছ থেকে একটি দারুণ টি-শার্ট কিনেছেন, অথবা এমন কোনো টুল কিনেছেন যা আপনার জীবন অনেকটা সহজ করে দিয়েছে। যদি এমন কিছু হয়, তাহলে একটি ইতিবাচক রিভিউ লিখে ফেলুন, আরও ভাল করার কোনো পরামর্শ থাকলে তাও লিখে ফেলুন। এতে উদ্যোক্তারা ও তাদের কর্মীরা নতুন উদ্যমে কাজ করার উৎসাহ পাবেন।
১১. গাছের যত্ন নিন
ঘরে গাছ থাকলে দেখতে সুন্দর দেখায়। পাশাপাশি আমাদের সুস্থ রাখার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ইনডোর প্ল্যান্ট আমাদের স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়ায়, আর ফুল আনন্দ বাড়ায়।
তবে গাছের যত্ন নেওয়া মানে শুধু মাটিতে বীজ পুতে সময় মত পানি দেয়া না। গাছের যত্নে অনেক কিছুর দিকে মনোযোগ দিতে হয়। সঠিক টব ও মাটি নির্বাচন করতে হবে, ভাল সার খুঁজে বের করতে হবে, এমন ভাবে গাছ রাখতে হবে যাতে তা পর্যাপ্ত আলো ও পানি পায়, দরকার পড়লে মাঝেমধ্যে পাতা ও ডাল কেটে দিতে হবে, অথবা চারদিকে বেড়া দিতে হবে, গাছের বেড়ে ওঠার দিক নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
বুঝতেই পারছেন, ইনডোর প্ল্যান্টের অনেক যত্ন দরকার হয়। তাই একঘেঁয়ে অনুভব করলে কিছু ইনডোর প্ল্যান্ট নিয়ে আসুন ও সেগুলির যত্ন নিন।
১২. পারিবারিক স্মৃতি সংরক্ষণ করুন
দাদা-দাদি বা নানা-নানি কি তাদের ছোটবেলা নিয়ে কোনো গল্প শুনিয়েছেন? আপনার বাবা-মার কাছ থেকেও হয়ত তাদের জীবন নিয়ে নানারকম গল্প শুনেছেন। ছোটবেলায় শুনে থাকা এসব গল্প ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। অনেক সময় আমরা এসব বিষয়কে তেমন একটা গুরুত্ব দিই না, ভাবি অন্য কেউ হয়ত আবার গল্পগুলি বলবে।
তবে আমাদের বয়স যত বাড়ে, আমাদের পারিবারিক অভিজ্ঞতাও বদলাতে শুরু করে। আমাদের স্মৃতি বলতে থাকে কিছু গল্প ও পারিবারিক ছবি। তাই এগুলিকে সংরক্ষণ করে রাখা দরকার।
কিন্তু পারিবারিক স্মৃতি কীভাবে সংরক্ষণ করবেন?
• ফ্যামিলি ট্রি বানান
• পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে গল্প শুনুন
• পারিবারিক ছবি সংরক্ষণ করুন
‘বোরড’ হওয়াকে যত খারাপ আমরা ভাবি, আসলে তত খারাপ না। বরং এর কিছু অপ্রত্যাশিত উপকারিতাও আছে। অতিরিক্ত একঘেয়েমি অবশ্যই ভাল না, এজন্য সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই হল মূল কথা। পরেরবার যখন বোরড হবেন কিছু করে সময় কাটানোর জন্য অস্থির হয়ে পড়বেন না। খালি সময়টিকে গ্রহণ করুন এবং দেখুন তা আপনার মনকে কোথায় নিয়ে যায়। হয়ত আশ্চর্য হওয়ার মত কিছু আবিষ্কার করতে পারবেন।
#সময় #কাজ #একঘেয়েমি