26/02/2026
*সিয়াম শিক্ষা কার্যক্রম*
(বিষয়: সিয়াম না রাখার বৈধ কারণসমূহ):
*_ভূমিকা:_* সিয়াম ইসলামী জীবন বিধানের অন্যতম প্রধান ইবাদত, যা আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাকওয়া অর্জনের জন্য ফরজ করা হয়েছে। তবে, ইসলাম একটি সহজ ও ব্যালান্সড জীবন বিধান, যেখানে মানুষের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে বিশেষ কিছু শর্তে সিয়াম স্থগিত বা ভঙ্গ করার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সিয়াম পালন স্থগিত করা বৈধ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিয়ামের পরিবর্তে ফিদিয়া প্রদানের বিধানও রয়েছে। এ প্রবন্ধে অসুস্থতা, বার্ধক্য, সফর, হায়েয-নেফাস এবং গর্ভধারণ ও দুগ্ধদানকারী নারীদের জন্য সিয়াম না রাখার বৈধ কারণসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
*১. অসুস্থতা এবং বার্ধক্যজনিত অবস্থায় সিয়াম পালনের বিধান*:
অসুস্থতার কারণে যদি কোন ব্যক্তি ফরজ সিয়াম রাখতে না পারে, তবে সুস্থ হয়ে উঠলে সে কাযা সিয়াম পালন করবে। আল্লাহর বাণী: অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে এই (সিয়ামের) সংখ্যা পূরণ করে নিবে (২:১৮৪)। অসুস্থতার কারণে যদি কোন ব্যক্তির সিয়াম রাখা কষ্টসাধ্য হয় তবে সিয়াম ভঙ্গের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে সুস্থ হলে অতিসত্তর রমযান মাসের পরে অন্য কোন মাসে সিয়ামের কাযা আদায় করে নেবে।
_(ক). ফিদিয়া দেওয়ার হুকুম:_ দীর্ঘ মিয়াদি অসুস্থ ব্যক্তি, যার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কম এবং বার্ধক্যজনিত কারণে সিয়াম রাখতে অক্ষম বয়স্ক ব্যক্তির জন্য প্রত্যেক সিয়ামের পরিবর্তে ফিদিয়া দেওয়া আবশ্যক। সে প্রতিটি সিয়ামের জন্য প্রত্যেক দিন ফিদিয়া স্বরূপ একজন মিসকিন খাওয়াবে।
_(খ). আনাস বিন মালিক (রা.)-এর আমল:_ প্রখ্যাত সাহাবা আনাস বিন মালিক (রা.) বার্ধক্য জনিত কারণে প্রত্যেক সিয়ামের জন্য প্রত্যেক দিন একজন মিসকিন খাওয়াতেন। যে সকল পুরুষ বা মহিলা সিয়াম রাখতে সক্ষম নয়, তারা প্রত্যেক দিন একজন মিসকিন খাওয়াবে (বুখারী:৪৫০৫)। একজন মিসকিনকে প্রতিদিন অর্ধেক সা খেজুর বা গম বা চাল বা যে কোন দেশীয় খাবার দিতে হবে (অর্ধেক সা এর ওজন প্রায় ১.৫ কে.জি.)।
*২. সফরে মুসাফিরের জন্য সিয়াম পালনের বিধান*:
মুসাফির ব্যক্তি সফরে ইচ্ছা করলে রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করতে পারে এবং সিয়াম ভঙ্গ করা তার জন্য শারি’য়াত সম্মত বৈধ। সফরের কারণে যে কয়টি সিয়াম কাযা হয়েছে তা রমযান মাসের পরে অন্য কোন মাসে কাযা আদায় করা ফরজ।
_(ক). আল্লাহর বাণী:_ অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে এই (সিয়ামের) সংখ্যা পূরণ করে নিতে হবে (২:১৮৪)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে সফরে সিয়াম রাখার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে, তিনি বলেন: ইচ্ছা করলে তুমি সিয়াম পালন করতে পার, আবার ইচ্ছা করলে নাও করতে পার (বুখারী-ইফাবা: ১৮১৯; সিয়াম অধ্যায়)।
_(খ). মহানবী (ﷺ) সফরে রমযানের সিয়াম ভঙ্গ করেছেন:_ মহানবী (ﷺ) মক্কার পথে রমযানের সিয়াম অবস্থায় যাত্রা শুরু করেন এবং কুদাঈদ নামক স্থানে পৌঁছে তিনি সিয়াম ভেঙ্গে দেন। অতঃপর, সাহাবাগণ (রা.)-ও সিয়াম ছেড়ে দেন। সফরে যেমন সালাত কসর করা বৈধ, তেমনি সফরে সিয়াম ভঙ্গ করাও বৈধ এবং বৈধ সফরের কারণে সিয়াম ভঙ্গ করা যাবে। যদি কোন মুসাফির সফরের সিয়াম রাখতে চায়, সে সিয়াম রাখতে পারবে এবং তার সিয়াম রাখা বৈধ বলে গণ্য হবে এবং তা তার পক্ষে যথেষ্ট হবে।
_(গ). সফরে সিয়াম ভঙ্গকারীকে দোষারোপ না করা:_ সফরকালীন সময়ে সিয়াম পালন করা ও না করার ব্যাপারে সাহাবী (রা.)-গণ একে অন্যের প্রতি দোষারোপ করতেন না, এই মর্মে আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে সফরে যেতাম। সায়িম ব্যাক্তি গায়ের সায়িমকে (যে সিয়াম পালন করছে না) এবং গায়ের সায়িম ব্যাক্তি সায়িমকে দোষারোপ করত না (বুখারী-ইফাবা: ১৮২৩; সিয়াম অধ্যায়)।
_(ঘ). সফরে কখন সিয়াম ভঙ্গ করা উত্তম:_ যদি সিয়াম মুসাফিরের জন কঠিন হয় এবং সে কোন ভাবে সিয়ামের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তার জন্য সিয়াম ভঙ্গ করায় উত্তম। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘এক সফরে প্রচণ্ড গরমের জন্য এক ব্যক্তির উপর ছায়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর বাণী: সফরে সিয়াম পালন করায় কোন নেকী নেই। (বুখারী-ইফাবা: ১৮২২; সিয়াম অধ্যায়)।
*৩. হায়েয (মাসিক-ঋতুস্রাব) এবং নেফাস যুক্ত অবস্থায় সিয়াম পালনের বিধান*:
_(ক). মহিলাদের হায়েয ও নিফাস অবস্থায় সিয়াম রাখা নিষেধ:_ রামজান মাসে যে মহিলার হায়েয অথবা যে মহিলার নেফাস হবে, সে অবশ্যই সিয়াম ভঙ্গ করবে এবং এ অবস্থায় তার জন্য সিয়াম রাখা হারাম। যদি সে এই অবস্থায় সিয়াম রাখে তবুও সিয়াম বিশুদ্ধ হবে না। আবূ সা’ঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: হায়েয অবস্থায় মহিলারা কি সালাত ও সিয়াম থেকে বিরত থাকে না? তাঁরা বললেন, ’হাঁ’। তিনি বললেন: এ হচ্ছে তাদের দ্বীনের কমতি (বুখারী-ইফাবা: ২৯৮; হায়েয অধ্যায়)। আর, তাদের উপর সিয়াম কাযা করা আবশ্যক, সালাত কাযা করা আবশ্যক নয়।
_(খ). হায়েয এবং নেফাসযুক্ত মহিলার জন্য সিয়ামের কাযা:_ হায়েয মহিলার ওপর সিয়াম কাযা আদায় ফরজ, তবে সালাত কাযা করা আবশ্যক নয়, এই মর্মে আয়িশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হল, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে আমাদের কারো হায়েয হলে পরে আমাদেরকে কেবল সিয়াম কাযা করার নির্দেশ দেয়া হত, সালাত কাযা করার নির্দেশ দেয়া হত না’ (মুসলিম-ইফাবা: ৬৫২; ৬৫৪; হায়েয অধ্যায়)।
*৪. গর্ভধারণ এবং দুগ্ধদানকারিনী মহিলাদের সিয়াম পালনের বিধান*:
_(ক). গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিণী মহিলাদের জন্য সিয়াম স্থগিত:_ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: আল্লাহ তা’আলা মূসাফির থেকে অর্ধেক সালাত মাফ করে দিয়েছেন; আর গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিণী মহিলাদের জন্য সিয়াম পালন মাফ করে দিয়েছেন। আনাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এই উভয়টির অথবা এর একটির কথা বলেছেন। (তিরমিজী-ইফাবা: ৭১৩; ইবনু মাজাহ-ইফাবা: ১৬৬৭, সিয়াম অধ্যায়)। তবে গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারিণী মহিলাদের জন্য সিয়ামের কাযা করতে হবে।
_(খ). গর্ভবতী ও দৃগ্ধদানকারিণী সিয়ামের পরিবর্তে প্রত্যহ মিসকীন খাওয়াবে:_ আল্লাহ বলেন, ‘যারা সামর্থবান তারা মিসকীনদের ফিদিয়া প্রদান করবে (২:১৮৪)’। ইবন আব্বাস (রা.) বলেন, এ আয়াতটি অতি বৃদ্ধ-বৃদ্ধা লোকের জন্য ঐচ্ছিক ব্যবস্থা স্বরূপ। যদি তারা সিয়াম রাখতে সমর্থ হয়, তবে সিয়াম রাখবে, অন্যথায় প্রত্যহ একজন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়াবে। আর গর্ভবতী ও দৃগ্ধদানকারীণী স্ত্রীলোকগণ যদি সন্তানের ক্ষতির আশংকা বোধ করে, তবে তাদের জন্যও এ নির্দেশ বহাল রয়েছে অর্থাৎ সিয়ামের বদলে প্রত্যহ একজন মিসকীনকে খাদ্য খাওয়াবে। ইমাম আবূ দাঊদ (রাহি.) বলেন, যদি তারা তাদের সন্তানের ব্যাপারে শংকিত হয়, তবে তারা সিয়াম না রেখে মিসকীনকে খাদ্য খাওয়াতে পারে (আবূ দাঊদ-ইফাবা: ২৩১২; সিয়াম অধ্যায়)।
*৫. উপসংহার*: ইসলাম একটি সহজ, বাস্তবধর্মী ও মানবিক জীবনব্যবস্থা। সিয়াম ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলেও এটি পালন করতে গিয়ে যদি কারো শারীরিক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তবে তার জন্য ইসলাম সহজতার বিধান রেখেছে।
অসুস্থতা, বার্ধক্য, সফর, হায়েয-নেফাস এবং গর্ভধারণ বা দুগ্ধদানকারী নারীদের জন্য সিয়াম ভঙ্গের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে কাযা আদায় বা ফিদিয়া প্রদান করার বিধান রয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম মানুষের কষ্ট বা দুর্ভোগ চায় না বরং তাদের জন্য সহনীয় ও কল্যাণকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।
অতএব, প্রতিটি মুসলিমের উচিত এসব বিধান সম্পর্কে জানা ও যথাযথভাবে আমল করা, যাতে সিয়াম সংক্রান্ত ইসলামের সহজ, প্রজ্ঞাপূর্ণ ও কল্যাণকর বিধান অনুসরণ করা যায়।
*আল্লাহ-হুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন।*