19/12/2025
আজকের বাংলাদেশে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি যতটা উচ্চারণ করা হয়, বাস্তবে তার ব্যবহার ততটাই সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। রাষ্ট্রের ভাষায় আমরা স্বাধীন, কিন্তু নাগরিক জীবনে সেই স্বাধীনতার সীমারেখা প্রতিদিন নতুন করে আঁকা হচ্ছে। কী বলা যাবে, কোথায় বলা যাবে, কাকে প্রশ্ন করা যাবে—এই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণই বুঝিয়ে দেয়, স্বাধীনতা আর স্বতঃসিদ্ধ অধিকার নেই, বরং শর্তসাপেক্ষ বাস্তবতা।
ফেসবুক খুললেই বোঝা যায়, মানুষ এখন নিজের মত প্রকাশের আগে দু’বার নয়—দশবার ভাবে। সাংবাদিক, লেখক, শিক্ষক, এমনকি সাধারণ নাগরিকও জানে—একটি পোস্ট, একটি মন্তব্য, একটি প্রশ্নই হয়ে উঠতে পারে বিপদের কারণ। আইন এখানে ন্যায়বিচারের রক্ষক না হয়ে অনেক সময় হয়ে ওঠে ভয় তৈরি করার হাতিয়ার। সংবাদপত্রের পাতায় প্রায়ই চোখে পড়ে—গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ, মামলা, নিঃশব্দ করে দেওয়া কণ্ঠ।
এই জায়গাতেই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: রাষ্ট্র কি নাগরিকের স্বাধীনতার নিরাপত্তা দিচ্ছে, নাকি নিজের ক্ষমতার পরিসর রক্ষা করতেই স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখছে? যখন রাষ্ট্র নিজেই স্বাধীনতার সীমা নির্ধারণ করে দেয়, তখন সেই স্বাধীনতা আর নাগরিকের থাকে না—তা রয়ে যায় ক্ষমতার কাঠামোর ভেতর।
আমরা এমন এক বাস্তবতায় পৌঁছেছি, যেখানে স্বাধীনতা আর মানুষের সঙ্গে জন্মায় না—তা প্রয়োগ করতে হলে অনুমতির ছায়া খুঁজতে হয়। রাষ্ট্র যত শক্তিশালী হয়, নাগরিকের কণ্ঠ তত নীরব হয়—এই অদ্ভুত সমীকরণই আজ আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই নিয়ন্ত্রণকে ধীরে ধীরে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়া হচ্ছে। প্রশ্নহীনতা হয়ে উঠছে নিরাপত্তা, আর নীরবতা হয়ে উঠছে বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। অথচ ইতিহাস বারবার বলেছে—যে রাষ্ট্র নাগরিকের স্বাধীনতাকে সন্দেহের চোখে দেখে, সে রাষ্ট্র একদিন নাগরিকের আস্থাও হারায়।
শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতেই হয় সেই তিক্ত সত্যের দিকে—এই দেশে স্বাধীনতা অনেক সময় নাগরিকের অধিকারে নয়, বরং রাষ্ট্রের ক্ষমতার পরিধির মধ্যেই আটকে থাকে। যতদিন তা বদলাবে না, ততদিন স্বাধীনতার কথা বললেও বাস্তবে আমরা সবাই এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত নীরবতার ভেতরেই বেঁচে থাকব।