21/08/2026
আমাদের সমাজে একজন নবজাতক জন্ম নেওয়ার ঠিক পরমুহূর্তের দৃশ্যটা একবার ভাবুন। ফুটফুটে একটা শিশু পৃথিবীতে এলো, চারপাশের মানুষগুলো তাকে দেখতে গিয়ে প্রথমেই কী করে? বাচ্চার কপালে কয়লা বা কাজলের একটা বিশ্রী কালো ফোঁটা এঁকে দেয়, কিংবা হাতে-কোমরে পরিয়ে দেয় কালো সুতো আর তাবিজ।
মুখে সবার একটাই কথা, "নজর লাগবে, কালো ফোঁটা দিলে কোনো অমঙ্গল ছুঁতে পারবে না!"
শুধু কি তাই? পরীক্ষার সকালে ডিম খেলে নাকি পরীক্ষায় গোল্লা পাবে, রাস্তায় বের হয়ে খালি কলসি বা বিড়াল দেখলে যাত্রা অশুভ হবে, পেঁচা ডাকলে অমঙ্গল ঘনিয়ে আসবে, কিংবা কোনো নারী বিধবা হলে তাকে শুভ কাজে সামনে আসতে না দেওয়া। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের মগজে এই কুসংস্কারগুলো এমনভাবে গেঁথে দেওয়া হয়েছে যে, আমরা শিক্ষিত হচ্ছি, বড় বড় ডিগ্রি নিচ্ছি, কিন্তু মানসিকতার দিক থেকে সেই আদিম অন্ধকারের কারাগারেই বন্দী হয়ে আছি।
একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবুন তো, যে সৃষ্টিকর্তা আকাশ আর জমিনের মালিক, যিনি পুরো মহাবিশ্বকে এক নিখুঁত নিয়মে পরিচালনা করছেন, তাঁর সৃষ্টির নিরাপত্তা কি এক চিমটি কালো কাজলের ফোঁটার ওপর নির্ভর করে? এত সস্তা কি মানুষের বিশ্বাস?
এই কুসংস্কারগুলো কেবল কিছু নিরীহ বিশ্বাস নয়, এগুলো আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্বকে ভেতরে ভেতরে পঙ্গু করে দিচ্ছে। মানুষ তার নিজের ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে শেখে। পরীক্ষা খারাপ হয়েছে কারণ ডিম খেয়েছিল, ব্যবসায় লোকসান হয়েছে কারণ ঘর থেকে বের হওয়ার সময় অমুক অশুভ মুখটা দেখেছিল। মানুষ নিজের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলে এবং এক অদ্ভুত কাল্পনিক ভয়ের দাস হয়ে বাঁচে। এর চেয়েও ভয়ংকর হলো, এই কুসংস্কারের বলি হয়ে কত নিরীহ মানুষকে সমাজে অপয়া বা অশুভ তকমা দিয়ে মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়!
অথচ আমাদের দ্বীন, আমাদের পবিত্র কুরআন মানুষকে সবসময় অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে যুক্তি, সচেতনতা ও এক আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে খুব স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে:
"আর আল্লাহ যদি তোমার কোনো অমঙ্গল করেন, তবে তিনি ব্যতীত তা দূর করার কেউ নেই। আর তিনি যদি তোমার কোনো কল্যাণ চান, তবে তাঁর অনুগ্রহ প্রতিহত করারও কেউ নেই।" (সূরা ইউনুস: ১০৭)
যদি সমস্ত ক্ষমতা, সমস্ত ভালো আর মন্দের চাবিকাঠি একমাত্র আল্লাহর হাতেই থাকে, তবে এই তুচ্ছ কালো ফোঁটা, অলক্ষুনে বিশ্বাস আর তাবিজের সুতোর পেছনে কেন আমরা ঈমান আর আত্মবিশ্বাস দুটোকেই বিকিয়ে দেব?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বদনজর থেকে বাঁচার জন্য এবং বাচ্চাদের নিরাপত্তার জন্য সুনির্দিষ্ট দোয়া, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে ফুঁ দেওয়ার সুন্নাহ শিখিয়েছেন। অথচ আমরা সেই সুন্দর ঐশ্বরিক সমাধান ছেড়ে সস্তা কুসংস্কারের পেছনে অন্ধের মতো ছুটছি।
বিজ্ঞান আর যুক্তির এই যুগে এসে এবার আমাদের এই শিকল ভাঙার সময় এসেছে। নিজের সন্তানদের অন্ধভয় নয়, বরং আল্লাহর ওপর অগাধ তাওয়াক্কুল ও আত্মবিশ্বাসের পাঠ দিন। কাল্পনিক অমঙ্গলের ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকার চেয়ে নিজের কর্ম আর চিন্তাকে সুন্দর করুন। কুসংস্কারের অন্ধকার ফুঁ দিয়ে দূর করে আসুন আমরা মুক্তচিন্তা, বিশুদ্ধ বিশ্বাস আর সাহসের এক নতুন সমাজ গড়ে তুলি।