27/06/2024
মোবাইল দিয়ে প্রফেশনাল গ্রাফিক ডিজাইন করে টাকা উপার্জন??? জনশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
“মোবাইল দিয়ে গ্রাফিক ডিজাইন করে ঘরে বসে ডলার উপার্জন করুন” এরকম একটা বিষয় এখন খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছে, বিশেষ করে যারা নতুন ফ্রিল্যান্সিং শিখতে আসছে তাদের মধ্যে।
আজকে আমি সে বিষয়টা নিয়েই বিস্তারিত বলার চেষ্টা করব।
আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে এই লেখাটা সম্পূর্ণ পড়ার পর আপনি একদম পরিষ্কার হয়ে যাবেন যে কথাটা কতটুকু বাস্তব ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এটা সম্পূর্ণ বেসিক লেভেলের আলোচনা, তাই আপনাকে এটা বোঝার জন্য খুব বেশি আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির জ্ঞান জানার প্রয়োজন হবেনা।
তাহলে চলুন প্রথমেই জানার চেষ্টা করি গ্রাফিক ডিজাইন ব্যাপারটা কী?
গ্রাফিক ডিজাইন কী
বিভিন্ন ধরনের চিত্র, টেক্সট (লেখা), রং ব্যবহার করে কোন তথ্য বা ধারণাকে প্রকাশ করার নামই গ্রাফিক ডিজাইন।
আপনি হয়তো একটু আলাদা কিছু শুনে থাকতে পারেন কিন্তু, ঘুরেফিরে কথাটা একই, কোন চিত্রের মাধ্যমে কোন বার্তা তুলে ধরা।
গ্রাফিক ডিজাইন হল ভিজুয়াল কমিউনিকেশন; মানে দৃশ্যমান কোন কিছুর দ্বারা যোগাযোগ সাধন করা।
ব্যাপারটা একটু খোলাসা করে বলি; ধরুন কাউকে আপনি বিদায় বেলায় হাত ইশারা করে টা টা বাই বাই দিলেন। এতে কিন্তু কোন কথা বললেন না। তারপরও কিন্তু এটা একটা কমিউনিকেশন; কারণ আপনি হাত ইশারা করে বুঝাতে চেয়েছেন যে “ঠিক আছে, বিদায়”। অপরপ্রান্তের মানুষটাও ঠিক এই ব্যাপারটা বুঝে গেছে।
এখানে আপনি যে যোগাযোগটা করলেন টা শুধুমাত্র দেখার সাথে সম্পর্কযুক্ত; তাই এটা হল ভিজুয়াল কমিউনিকেশন। আচ্ছা এটাকে তাহলে কি আমরা গ্রাফিক ডিজাইন বলব?
উত্তরটা হচ্ছে, “অবশ্যই না”। কারণ, গ্রাফিক ডিজাইন ভিজুয়াল কমিউনিকেশন ঠিক আছে। গ্রাফিক ডিজাইন হবার জন্য এটাকে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হবে। আর তা হল, কমিউনিকেশন টা সম্পন্ন হতে হবে কোন চিত্রের মাধ্যমে।
এখন, আপনি যদি বিষয়টাকে চিত্র এঁকে তুলে ধরতে পারেন; যেমনঃ একটা হাতের ছবি আঁকলেন যেখানে হাতটি টা টা দেওয়ার মত ইশারা করে আছে। তখন এটাকে গ্রাফিক ডিজাইন বলা যাবে।
গ্রাফিক ডিজাইনার
যিনি গ্রাফিক ডিজাইন করেন তাকে গ্রাফিক ডিজাইনার বলা হয়। এই যে উপরের হাতের ছবিটা আপনি আঁকলেন, এখানে আপনি একজন গ্রাফিক ডিজাইনার। একজন গ্রাফিক ডিজাইনার নির্দিষ্ট বা বিশেষ কোন তথ্য বা বার্তা তুলে ধরার জন্য তার সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরণের ভিজুয়াল এলিমেন্ট তৈরি করেন।
গ্রাফিক ডিজাইনের উদ্দেশ্য
শুরু থেকেই বলে আসছি গ্রাফিক ডিজাইন হল ভিজুয়াল কমিউনিকেশন। সুতরাং, এর সংজ্ঞা থেকেই এটা স্পষ্ট যে গ্রাফিক ডিজাইন কেন করা হয়; আর তা হল দৃশ্যত আকর্ষণীয় কোন পণ্য (পণ্য বলতে কলম কে বোঝানো হচ্ছেনা; কলমের ডিজাইন, কলমের রং, এর গায়ের প্যাটার্নকে বোঝানো হচ্ছে; কলম এখানে একটা উদাহরণ মাত্র) তৈরি করা যা বিশেষ কোন তথ্য বা বার্তাকে তুলে ধরতে সক্ষম।
প্রফেশনাল গ্রাফিক ডিজাইন এবং ডিজাইনার
প্রফেশন বা পেশা ব্যাপারটা তো বোঝেনই, প্রচলিত যে কোন কাজ যা কেউ একজন নিয়মিত করে এবং তার বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ পারিশ্রমিক সে পায়। এখন প্রফেশনাল গ্রাফিক ডিজাইনার ব্যাপারটাকেও একইভাবে বলা যায়; কেউ একজন নিয়মিত গ্রাফিক ডিজাইন করছে এবং তার বিনিময়ে সে পারিশ্রমিক পাচ্ছে, সেই প্রফেশনাল গ্রাফিক ডিজাইনার।
গ্রাফিক ডিজাইন শিখে কেউ চাকরি করতে পারে, কেউ ফ্রিল্যান্স সার্ভিস দিতে পারে আবার কেউবা বিজনেস দাঁড় করতে পারে।
কেউ যদি তার নিজের কোন প্রয়োজনে টুকটাক গ্রাফিক ডিজাইন করে তাহলে তাকে তো আর প্রফেশনাল গ্রাফিক ডিজাইনার বলা উচিত হবেনা, তাই না?
আপনি যদি বাড়িতে কোনদিন আলুভর্তা করে খান তাহলে আপনি তো আর প্রফেশনাল শেফ হয়ে গেলেন না।
আবার এই প্রফেশনাল ব্যাপারটারও কিন্তু বিভিন্ন স্ট্যান্ডার্ড আছে। যেমন ধরুনঃ আমাদের দেশে মেস বা বাসাবাড়িতে যারা রান্না করেন তারা তো প্রফেশনাল শেফ, তাই না?
আবার অন্যদিকে, ইতালির কোন এক ফাইভ স্টার হোটেলের কোন একজন শেফ তিনিও তো প্রফেশনাল শেফ। দুইজনের কাজও তো একই; খাবার রান্না করা।
কিন্তু, দুইজনের যোগ্যতা, দক্ষতা, পেশাদারিত্ব, বেতন, ইত্যাদি কোনকিছুর তুলনা করলে কি এক হবে বলুন।
আপনি যেহেতু প্রফেশনাল ডিজাইন সার্ভিস দেবেন এবং ফ্রিল্যান্সার হবেন তাই আপনার দক্ষতা এবং পেশাদারিত্বও সেই মানের হতে হবে।
এখন ধরুন, আমি আমার বাড়ির পাশের একটা দোকানের জন্য একটা সাইনবোর্ড ডিজাইন করব। আর আপনি নিউইয়র্কের কোন একটা সুপারশপ এর জন্য একইরকম কিছু একটা ডিজাইন করবেন।
দুইজনের কাজ একই হলেও আর কোন কিছুই কিন্তু এক হবেনা। আপনার ক্লায়েন্ট চাইবে ডিজাইনটাতে যেন তাদের ব্র্যান্ড ফুটে ওঠে, বিশেষ কোন বার্তা যেন থাকে, কালার, ডিজাইন হায়ারার্কি ইত্যাদি ডিজাইন ফান্ডামেন্টাল গুলো যেন ঠিক থাকে।
এসব ঠিক না থাকলে কোন ডিজাইন কাস্টমারদের আকৃষ্ট করেনা। আর এই বিষয়টা আপনার ক্লায়েন্ট খুব ভালো করে জানে। তাই, সে এমন একজন ডিজাইনারকে খুঁজবে যে কিনা ওসব খুব ভালো জানে ও প্রয়োগ করতে পারে। আর তাই তার ডিজাইন এর বাজেটও অনেক বেশি।
অন্যদিকে, আমার ক্লায়েন্টের এসব কোন চাহিদা নাই।
এমনকি প্রায় সব ক্ষেত্রেই এসব ক্লায়েন্ট ডিজাইনের জন্য কোন বাজেটই রাখেনা। প্রিন্টিং কোম্পানিগুলোই ফ্রিতে ডিজাইন করে দেয়।
এখন সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে আপনি কোন স্ট্যান্ডার্ডের ডিজাইনার হবেন এবং কোন স্ট্যান্ডার্ডের ডিজাইন করবেন।
আপনি যখন মোবাইল দিয়ে গ্রাফিক ডিজাইন করার স্বপ্ন দেখবেন তখন ডিজাইন দুনিয়ার মৌলিক বিষয়গুলো আপনার মাথায় ঢুকানোর প্রয়োজন মনে হবে না।
কিছুদিন পর এই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে রুপ নেবে। আপনি তখন বলে বেড়াবেন গ্রাফিক ডিজাইন করে কাজ পাওয়া যায়না, কাজের দাম নাই, ইত্যাদি ইত্যাদি।
প্রফেশনাল কাজের প্রফেশনাল টুল
আপনি যেহেতু গ্রাফিক ডিজাইনে ফ্রিল্যান্স সার্ভিস দেবেন ভেবেছেন তাই আপনার প্রফেশনাল দক্ষতার পাশাপাশি ভালো মানের প্রফেশনাল টুল প্রয়োজন হবে।
টুল মানে কাজ করার যন্ত্র, আপনার ক্ষেত্রে তা হল ডিজাইন সফটওয়্যার।
বিভিন্ন ডিজাইন সফটওয়্যার বর্তমানে পাওয়া যায়; তার মধ্যে Adobe Photoshop, Adobe Illustrator, Adobe InDesign এসব সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত। যদিও একেকটা একেক ধরণের ডিজাইনের জন্য ব্যবহার করা হয়।
Adobe ছাড়াও আরও অনেক জনপ্রিয় সফটওয়্যার আছে যেগুলো দিয়ে প্রফেশনাল ডিজাইন করা হয়।
এর পাশাপাশি এখন বেশকিছু টেমপ্লেট নির্ভর এবং মোবাইলে চালানোর উপযোগী কিছু অনলাইন এবং অফলাইন সফটওয়্যার বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে ক্যানভা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ক্যানভা দিয়ে মোবাইলে প্রফেশনাল গ্রাফিক ডিজাইন করে ডলার আয় করার অনেক ভিডিও ইউটিউব এ খুব দেখা হচ্ছে।
একটু আগে প্রফেশনাল ডিজাইন নিয়ে যা যা বললাম সেই মানদণ্ডে ক্যানভা এবং এরকম টেমপ্লেট নির্ভর কোন টুল কোন কাজে আসেনা।
ধরুন, আপনি পরিবহণ ব্যবসা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। তো তার জন্য যানবাহন দরকার যাতে করে মালামাল বা মানুষ পরিবহণ করা যাবে।
আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন সবচেয়ে কম খরচে কোন যানবাহনটা বানানো যায়। সমাধান পেয়েও গেলেন; একটা ঠেলাগাড়ি বানিয়ে ফেললেন।
সিদ্ধান্ত নিলেন বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য লন্ডনে পাঠাবেন আপনার সেই সহজে ও কম খরচে বানানো ঠেলাগাড়িতে করে।
ব্যাপারটা কি হাস্যকর নয়? আপনি কিন্তু লজিক্যালি ঠেলাগাড়িতে করেই মালগুলো লন্ডনে নিতে পারবেন। তাতে ছয় মাস লাগলে লাগুক লন্ডনে যাওয়াতো হল!
কিন্তু, আপনার সার্ভিসটা নেবে কেউ; একবার ভাবুনতো। আপনিই কি এরকম সার্ভিস নিতেন?
যে সার্ভিস কোন কাজের না তা কেউ নেয়ও না।
আপনি এবার একটা বিকল্প সমাধান বের করলেন; ঠেলাগাড়িটাকে বিমানে তুলে দিবেন, তাহলে তো দ্রুত যাওয়া যাবে!
আপনি যদি বিমানেই যাবেন তো ঠেলাগাড়ি কেন ভাই? একইরকম ভাবে আপনি বলবেন আমি ক্যানভা দিয়ে ইউনিক প্রফেশনাল ডিজাইন করব। তাহলে আবারও একই প্রশ্ন; প্রফেশনালই যদি করবেন তাহলে প্রফেশনাল সফটওয়্যার দিয়ে কেন নয়?
প্রফেশনাল কাজে প্রফেশনাল টুল আবশ্যক। আপনি বাঁশের কঞ্চি থেঁতলা করে বানানো তুলি দিয়ে মোনালিসা আঁকতে পারবেননা।
আপনি যদি ইতালির সেই শেফ এর হাতে আমাদের দেশীয় বাবুর্চির বঁটি তুলে দেন তাহলে কিন্তু টুনা মাছের সেই বিখ্যাত রেসিপিগুলো আশা করতে পারেননা।
মেসিকে যদি আপনার পাড়ার ধানক্ষেতের মাঠে নামিয়ে দিয়ে বিশ্বমানের গোল দেখার আশা করেন তাহলে তো হবে না। বিশ্বমানের গোলের জন্য বিশ্বমানের মাঠ, বিশ্বমানের বল প্রয়োজন হয়।
ওয়াজ মাহফিলের জন্য যে পোস্টারগুলো করা হয় সেগুলোর ডিজাইনের জন্য কিন্তু কোন টাকা দেওয়া লাগেনা। প্রিন্ট করালে ডিজাইন ফ্রি। মজার কথা হল সেই ডিজাইনগুলোও মোবাইল দিয়ে ক্যানভা দিয়ে করা হয় না। কম্পিউটার দিয়ে Adobe Illustrator ব্যবহার করেই করা হয়।
এখন আপনি বলতে পারেন ক্যানভা অথবা টেমপ্লেট ডিজাইনে সমস্যা কোথায়? ঠিক আছে বলছি।
ক্যানভা বা টেমপ্লেট কেন প্রফেশনাল নয়
মানুষ লাখ টাকা খরচ করে আইফোন কেন কেনে ভাই! নিজেকে আর দশজনের থেকে আলাদা করার জন্য।
এইযে আপনি নিজেকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করলেন, তাতে অর্থনৈতিক ভাবে আপনার কিন্তু কোন লাভ হলোনা। তারপরও মানুষ কিন্তু নিজেকে একটু আলদা, একটু বিশেষভাবে তুলে ধরার জন্য মরিয়া থাকে। সামান্য সুযোগও হাতছাড়া করতে চায়না।
এবার কোন কোম্পানি বা বিজনেস এর কথা চিন্তা করুন তো, নিজেদেরকে একটু আলাদা করে দেখাতে পারলে ওদের বিক্রি বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
আর তাই কোম্পানিগুলো তাদের কম্পিটিটরদের থেকে নিজেদেরকে আউটস্ট্যান্ডিং করার জন্য দু’হাতে টাকা খরচ করে।
তাহলে, যেসব কোম্পানি বা বিজনেস এর সামান্য সামর্থ্য আছে তারা কিন্তু এই আউটস্ট্যান্ডিং হওয়ার কম্পিটিশন থেকে পিছপা হতে চাইবেনা।
এখন, ক্যানভা বা টেমপ্লেট ব্যবহার করে ডিজাইন বানিয়ে আপনি তো আউটস্ট্যান্ডিং কিছু করতে পারবেননা। কারণ ক্যানভাতে যে টেমপ্লেটগুলো দেওয়া থাকে সেগুলো যে শুধু আপনিই ব্যবহার করেন তা তো নয়।
লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্যানভা ব্যবহার করে। তারাও আপনার মতই ওখানকার ডিজাইনগুলো একটু পরিবর্তন করে নিজের মত করে নেয়।
ওখানকার একেকটি ডিজাইন হাজার হাজার বার ব্যবহার হয়। তাহলে এখন একবার ভাবুনতো সেখানে ইউনিকনেস এর কী থাকে।
যেসব কোম্পানি তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ড স্টাইল বজায় রেখে চলে তারা তো জেনেরিক ডিজাইন নেবেনা।
আর যাদের এইসব ব্র্যান্ড, স্টাইল কোন কিছুর বালাই নাই তারা ডিজাইন এর পিছনে টাকা খরচ করাকে অপচয় মনে করে।
এখানে আরও একটা ব্যাপার আছে, ক্যানভা দিয়ে বা মোবাইল দিয়ে খুব বেসিক কিছু ডিজাইন ছাড়া গ্রাফিক ডিজাইন ক্যাটাগরির অন্য ডিজাইনগুলো করতেই পারবেন না; ইউনিকনেস তো পরের বিষয়।
পোস্টার ডিজাইন, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাড ডিজাইন এরকম কিছু ডিজাইনের জন্য ক্যানভার মত টুলগুলো চলে। আর লোগো ডিজাইনের কিছু প্রি-মেড আইকন থাকে যার সাথে টেক্সট বসিয়ে লোগো মত বানিয়ে নেওয়া যায়।
গ্রাফিক ডিজাইনের আরও যে ক্যাটাগরিগুলো আছে সেগুলোর জন্য যে সফটওয়্যার লাগে সেগুলো রান করার জন্যই ভালো মানের কম্পিউটার না হলে হয়না। সেখানে মোবাইল দিয়ে ডিজাইন করা তো অনেক দূরের পথ।
ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের না হলে কী সমস্যা
এখন আপনি হয়তো বলবেন আমি যদি ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস না দেই তাহলেই তো আর সমস্যা থাকেনা।
তাহলে আমি বলব থামুন! আপনি এবার আরও বড় সমস্যায় পড়লেন।
আপনি যদি চিন্তা করেন দেশীয় কোম্পানিতে ফ্রিল্যান্স ডিজাইন সার্ভিস দেব তাহলে এইখানে দুইটা সমস্যা - ১. ভালো কোম্পানি এখানেও ভালো ডিজাইন চাইবে।
২. বেশিরভাগ কোম্পানিরই নিজস্ব ইন-হাউজ ডিজাইনার আছে।
আর সবার ওপর যে সমস্যাটা তা হল এখানকার বেশিরভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ডিজাইনের জন্য টাকা খরচ করাকে অপচয় মনে করে।
তারা ডিজাইনগুলো প্রিন্টিং কোম্পানি থেকে ফ্রিতেই পায়। বড়জোর চার পাঁচশো টাকা দিয়ে প্রিন্টিং কোম্পানির ডিজাইনার দিয়েই করায়।
আর যদি চিন্তা করেন কোন ডিজাইন এজেন্সিতে কাজ করবেন; তাহলে তো শুরু করার আগেই বাদ পড়বেন।
কারণ ওই এজেন্সিগুলোর প্রায় সবগুলোই বাইরের দেশ থেকে কাজ নেয়। আপনিতো ইন্টারন্যাশনাল পার্ট আগেই ছেড়ে দিয়েছেন।
সবশেষে থাকলো আমাদের দেশের ডিজাইনারদের জাতীয় নিশ ইউটিউব থাম্বনেইল ডিজাইন। ইন্টারন্যাশনাল থাম্বনেইল তো করবেনই না। দেশীয় কয়জন ইউটিউবার তাদের থাম্বনেইল ডিজাইন অন্যকে দিয়ে করায়?
আরে তারাই তো আপনাকে ক্যানভা শেখাল। আর এখন তারা আপনার থেকে ক্যানভা দিয়ে করা ডিজাইন টাকা দিয়ে কিনবে কেন? ওইটা তারা নিজেরাই করে।
এত যে নাই আর নাই বললাম, এর মধ্যেও কিন্তু অনেকেই কাজ পাচ্ছে ও করছে।
তাহলে আমি কি আপনাকে মিথ্যা ভয় দেখালাম?
না।
দেখুন, এটা কিন্তু আপনার পেশা হতে যাচ্ছে। এখান থেকে যদি আপনি চলার মত টাকা আয় করতে নাই পারেন তাহলে চলবে ক্যামনে?
আপনি যদি এরকম ডিজাইন করে কিছু কাজ পেয়েও যান তার দাম কেমন পাবেন? ৫ ডলার, ১০ ডলার এর বেশি অবশ্যই নয়।
এরকম এমাউন্টের কাজ করে মাসে বিশ হাজার টাকা আয় করতেই আপানকে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ টা ডিজাইন করতে হবে।
মাসে ২০ টা প্রোজেক্ট পাওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়।
ফ্রিল্যান্সিং এর সবচেয়ে কঠিন পার্টের কথাই আপনাকে কেউ কখনও বলেনা। বিশেষ করে যারা আপনার হাতে ক্যানভা তুলে দিয়েছে। আর সেইটা হল ক্লায়েন্ট জেনারেট করা।
শুধুমাত্র ক্লায়েন্ট কমিউনিকেশনের জন্যই যে কোর্সগুলো আছে তার দাম হাজার ডলার পর্যন্ত।
আর আপনাকে স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে মোবাইল হাতে নেন; ডলার আয় করা শুরু করেন।
দেখুন ডিজাইন আউটস্ট্যান্ডিং না হলে যেমন কারও নজরে আসেনা; তেমনি ডিজাইনার হিসেবেও তো আপনার আউটস্ট্যান্ডিং হতে হবে। না হতে পারলে নিয়মিত কাজ পাবেন না।
আর ফ্রিল্যান্সিং কিন্তু সরকারি কোন চাকরি না যে একবার একটা কাজ পেলেই জীবনে আর হারানোর কিছু নাই।
এখানে প্রতিদিন নতুন ক্লায়েন্টের জন্য চেষ্টা করতে হয়। এমনও অনেকেই আছেন যারা ৫, ৭, ১০ বছর নিয়মিত কাজ করার পর হঠাৎ করে কর্মহীন হয়ে পড়েন।
এবার আপনি হয়তো বলবেন ক্লায়েন্ট সার্ভিস দেয়া যেহেতু কঠিন কাজ আমি বরং ডিজাইন করে ফ্রিপিকে সেল করব।
বেশ ভালো চিন্তা করেছেন। ডিজাইন সেল করার সাইটগুলোতে এখন আর যেনতেন ডিজাইন, জেনেরিক ডিজাইন এপ্রুভ হয়না।
ওখানেও তো ডিজাইনগুলো কেউ না কেউ কেনে ভাই। ডিজাইন ভালো না হলে মানুষ এমনিতেই কেন টাকা খরচ করবে।
আর এসব সাইট থেকে মাসে ১০০ - ১৫০ ডলার আয় করতে হলে আপনার অন্তত কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার ডিজাইন সেখানে থাকতে হবে।
কারণ এদের কমিশন রেট খুব কম। আর যেসব সাইটে কমিশন ভালো সেখানে ডিজাইন এপ্রুভ করাতে সুপার ক্রিয়েটিভদেরও ঘাম ঝরাতে হয়।
শেষ কথা
দেখুন, আপনি একটা পেশা বেছে নিচ্ছেন; এটা তো আর এক দুই মাসের জন্য নয়। আপনি মাস তিনেক কষ্ট করে কোন কিছু শিখে এসে আরও মাস তিনেক কাজ করার চেষ্টা করলেন। ভালো কিছু না হলে বাদ দিয়ে দিলেন। আবার নতুন কিছু……। এভাবে তো আর জীবন চলেনা।
সিটি ব্যাংকের লোগো ডিজাইন করার জন্য Paula Scher ১.৫ মিলিওন ডলার চার্জ করেছেন। লোগো আইডিয়াটা কিন্তু খুব জটিল না। citi নামের “t” অক্ষরটাকে ছাতার মত একটা সেপ দিয়েছেন। আইডিয়াটা সিম্পল; পুরো “citi” কে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসা।
এখানে একটা কথা বলে রাখি; সিম্পল কিছুর মধ্যে কোন মেসেজ দেওয়া সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটা।
উনি ১.৫ মিলিওন ডলার চার্জ করেছেন আপনি সেখানে ৫০০ ডলার তো পেতেই পারেন। আমাদের দেশেই এমন শত শত ডিজাইনার আছেন যারা একটা লোগোর জন্য ৫০০ থেকে ১০০০ ডলার নিয়ে থাকেন। তাই বলে তাদের কিন্তু ক্লায়েন্টের অভাব হয়না।
আর আপনি ভাবছেন ৫ ডলারে সার্ভিস দেবেন।
আসলে যারা কোয়ালিটি সার্ভিস দেয় তাদের সংখ্যা খুব কম। আর যারা কোয়ালিটি সার্ভিস নেয় তাদের প্রচুর সার্ভিস নেওয়ার প্রয়োজন হয়। এজন্য এক্সপার্টরা বেশি চার্জ করলেও কাজ পেতেই থাকে।
অন্যদিকে, যারা সস্তা সার্ভিস নেয় তাদের কাছে বেশি কাজই থাকেনা; তার মধ্যেও বেশির ভাগ তারা নিজেরাই করে। কিন্তু লো কোয়ালিটি সার্ভিস দেওয়া লোকের সংখ্যা অনেক বেশি। তো, বুঝতেই পারছেন ব্যাপারটা।
আপনি যখন সাফল্যের সহজ রাস্তা খুঁজলেন তখন আসলে নিজের অজান্তে কঠিন রাস্তাটাই বেছে নিলেন। যেখানেই যান, যা কিছুই করেন স্কিল, কোয়ালিটি, প্রফেশনালিজম এসব ছাড়া কোনই গতি নাই। ফ্রিল্যান্সিং করতে গেলে তো আরও আগেই নাই।
যেটা শিখবেন সেটা খুব ভালভাবে শিখুন। পাশাপাশি পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং, কমিউনিকেশন স্কিল এসব ভালভাবে জেনে সার্ভিস দেয়া শুরু করুন।
আপনি অবশ্যই ভালো করবেন, ইনশাআল্লাহ্।