06/08/2026
"কালো কাঁচের জানালার ফাঁক দিয়ে সোডিয়ামের আলো ফুটতেই চোখ পড়লো ঘাড়ের বীভৎস কাটা দাগটায়। রোজিনার বুক কেঁপে উঠলো..."
আয়ান ও রক্তাক্ত চোরাবালি পর্ব-২
#আড্ডারসিক
গলা ভারী হয়ে এলো তার। দু-গাল বেয়ে অবাধে ঝরতে লাগলো তপ্ত অশ্রু। আর একটি শব্দও বেরুল না মহিলার মুখ দিয়ে, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো স্বামীর দিকে। স্বামীর গণ্ডদেশ বেয়ে দু-ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়তে দেখলো সে। এই প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও অশ্রু ফোঁটাকে আলাদা করে চিনতে পারলো সে।
স্বামীর মুখ দিয়েও কোনো কথা বেরুলো না, কিন্তু তার চোখ কথা বলে চলেছিল অনবরত। যেন বুকের সমস্ত বেদনা উগড়ে দিতে চাইছে সেই চোখ। স্বামীর চোখের দিকে চেয়েই মহিলা যা বোঝার বুঝে গেল। বুঝে গেল তাদের কিছুই করার নেই; বুঝতে পারলো এটাই বাস্তবতা।
তাদের মেয়েটি এমন এক পরিবারে জন্মেছে, যাদের জন্য পৃথিবী কখনো জায়গা করে রাখেনি। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা নেই। তারা বেঁচে থাকলেও কারও কিছু যায় আসে না, মরে গেলেও না।
দীর্ঘ এই জীবনযাত্রায় এই কথাগুলো কখনো তাদের মনে উঁকি দেয়নি, তারা যেন এই বাস্তবতাটি মেনেই নিয়েছিল। কিন্তু কেন জানি আজ তাদের এই অসহায়ত্বের উপর খুব অভিমান হচ্ছে, কেন জানি নিজের নিশ্চিত নিয়তির উপর বড়ই রাগ হচ্ছে।
হঠাৎ কিসের যেন আওয়াজ কানে আসলো। উভয়ে থমকে গিয়ে পরস্পরের দিকে চাইলো। পরক্ষণেই আওয়াজটি আবার কানে আসলো। এবার ঝলমলিয়ে উঠলো দু'জনের মুখ। নাহ! তারা ভুল শোনেনি, এটা যে একটা গাড়ির আওয়াজ!
দূর থেকে একজোড়া হলদেটে আলো ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। ওসমান মিয়া আর রোজিনা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল। গাড়ি—নিশ্চয়ই একটা গাড়ি। তাদের বুকের ভেতর ক্ষীণ আশার আলো জ্বলে উঠল। হয়তো আল্লাহ তাদের কথা শুনেছেন।
ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরে হলেও ভেসে থাকার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যায়, তাদের অবস্থাও এর থেকে কোনো অংশে কম নয়। এখন এটাই তাদের শেষ ভরসা, যদিও তা ক্ষীণ।
এদিকে গাড়িটা আরো কাছে চলে এসেছে। লোকটা তার স্ত্রীকে বললো— "দেহো রোজিনা, দেহো! আমার আল্লায় রহমতের দৃষ্টি দিছেন। অহন আমাগো মাইয়াডার কিচ্ছু হইবো না। আমাগো মাইয়া একবারে সুস্থ হইয়া যাইবো, দেইখো!"
রোজিনা বললো— "কিন্তু আমার কেন জানি ভয় করতাছে। আমরা হইলাম গিয়া ফকির-মিসকিন, এই রাত-বিরাতে কেউ কি আমাগো সাহায্য করবো?
স্বামী বললো— "এইসব তুমি কি কইতাছো রোজিনা? আল্লাহ্ যহন পাঠাইছে, খালি হাতে ফেরত নিবো না। মানুষডা সাহায্য করবই।
এই বলে লোকটি রাস্তায় নেমে পড়লো এবং দু-হাত উপরে উঠিয়ে চিৎকার করে গাড়ি চালকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে লাগলো। গাড়িটা এখন অনেক কাছে চলে এসেছে। স্পষ্ট দেখা গেল সেটি টয়োটা প্রিমিওর পুরোনো মডেলের একটি সাদা সেডান। গাড়ির নম্বরপ্লেট কাদায় মাখামাখি ছিল। শেষের দুটি সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল না— ৩৭।
গাড়িটির সামনের ডানদিকের ফেন্ডারে হালকা একটা ডেন্ট ছিল। আর পেছনের উইন্ডশিল্ডের নিচে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া একটা স্টিকার আটকে ছিল, তবে এত দূর থেকে লেখা পড়ার উপায় নেই।
বৃষ্টিতে ধুয়ে যেন তার রঙ আরো উজ্জ্বল হয়ে গেছে। ল্যাম্পপোস্টের সোডিয়াম লাইটের হলদে আলো গাড়িটার গায়ে লেগে প্রতিফলিত হয়ে আশপাশ আলোকিত করে তুলছে।
এবার গাড়ির হেডলাইটের আলো সোজা এসে পড়লো ওসমান মিয়ার চোখে, সাথে সাথে ধাঁধিয়ে গেল তার চোখ। কিন্তু এতটুকুও কমলো না গাড়ির গতি। আঁতকে উঠলো রোজিনা বেগম। সে চিৎকার করে স্বামীকে সতর্ক করতে যাবে, তার আগেই বিকট শব্দে ব্রেক কষলো গাড়িটা—ঠিক ওসমান মিয়ার হাত দেড়েক সামনে।
এভাবে জোরে ব্রেক ধরায় রাস্তার নোংরা কাদাপানি ভিজিয়ে দিলো ওসমান মিয়াকে। কিন্তু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো রোজিনা বেগম, এমনকি ওসমান মিয়ার অবস্থা দেখে এই পরিস্থিতিতেও তার একটু হাসি পেল।
ওসমান মিয়া গাড়ির জানালার কাছে গিয়ে বললো— "বাবু! আমাগোরে বাঁচান, আমাগো মাইয়াডা জ্বরে পুইড়া যাইতেছে! ওরে অহনি ডাক্তারখানা লইয়া না গেলে হয়তো আর কোনোদিন ওর মুখ দেখবার পারুম না, বাবু! অহন আফনেই আমগো একমাত্র ভরসা। আফনের পায়ে পড়ি বাবু, আমগো মাইয়াডারে বাঁচান!"
গাড়িটার কালো কুচকুচে জানালার কাঁচ সামান্য ফাঁক হলো। ভেতর থেকে একটি গুরুগম্ভীর আওয়াজ ভেসে এলো— "উঠে পড়ুন গাড়িতে।"
আনন্দের অতিশয্যে ওসমান মিয়ার গাল বেয়ে দু-ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়লো। রোজিনা বেগম এতক্ষণ উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে ছিল তাদের দিকে। বোধহয় তাদের মাঝে কি কথোপকথন চলছিল তা শোনার চেষ্টা করছিল, নতুবা কোনো অজানা আশঙ্কা তাকে বাধ্য করছিল সজাগ দৃষ্টি রাখতে।
ওসমান মিয়া তাড়াতাড়ি রোজিনা বেগমের দিকে ফিরতেই রোজিনা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো। ওসমান মিয়া চোখের ইশারায় তাকে কাছে ডাকলো। রোজিনা বেগম তাড়াতাড়ি করে মেয়েকে যথাসম্ভব শাড়ির আঁচলে ঢেকে ওসমান মিয়ার কাছে এলো।
ওসমান মিয়াকে তার স্ত্রী বললো— "রোজিনা! বাবু রাজি হইছে। অহনি তুমি গাড়িত উঠা উইঠ্যা বসো।"
রোজিনা বেগম গাড়ি চালকের দিকে লক্ষ্য করলো। কিন্তু একে তো কালো কুচকুচে জানালার কাঁচ, তার উপর গাড়ির ভেতরে কোনো লাইট জ্বলছে না, তাই কিছু দেখতে পেল না সে। জানালার সরু ফাঁক দিয়ে ল্যাম্পপোস্টের আলো ভেতরে ঢুকল। মুহূর্তের জন্য লোকটার ঘাড়ের এক পাশ আলোকিত হয়ে উঠল।
রোজিনার বুক কেঁপে উঠল।
কানের নিচ থেকে আড়াআড়ি নেমে গেছে একটা পুরনো কাটা দাগ। দাগটা শার্টের কলারের ভেতরে হারিয়ে গেছে।
লোকটা বোধহয় বুঝতে পারলো যে রোজিনা বেগম তাকে লক্ষ্য করছে। তাই আবারও গুরুগম্ভীর সুরে বললো— "উঠতে চাইলে জলদি উঠুন, নইলে আমি চললাম। আমার বাড়ি ফেরার তাড়া আছে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে আপনাদের মেয়ে সুস্থ হয়ে উঠবে না, যা করার তাড়াতাড়ি করুন।" এই বলে সে জানালার কাঁচ উঠিয়ে নিল।
ওসমান মিয়া আর কথা না বাড়িয়ে রোজিনা বেগমের কোল থেকে মেয়েকে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লো এবং রোজিনা বেগমকে ফিসফিসিয়ে বললো— "তুমি না আস্ত একডা বোকা! একডা লোক আমাগো সাহায্য করবার চাইতাছে, আর তুমি কিনা হের উপর সন্দেহ করতাছো! চুপচাপ গাড়িত উইঠ্যা বইসো, আর একডা কথাও কইবা না।"
রোজিনা বেগমও স্বামীর কথামতো চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসলো। চাপা একটা গর্জন আর মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি স্টার্ট হলো।
এদিকে বাইরে ঝড় থেমে গেছে, শুধুই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে আর কিছুক্ষণ পর পর আকাশ বিকট শব্দে ডেকে উঠছে। পুরো শহরে ইলেকট্রিসিটি নেই, রাত ১০টার দিকেই বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু রাস্তার ধারের পোলগুলোর সোডিয়াম লাইট টিম টিম করে জ্বলছে। তারই মাঝে গাড়িটি চলছে।
যাত্রী ও চালক মিলে গাড়িতে মোট চারজন, কিন্তু সকলের মনের অবস্থা ভিন্ন। ওসমান মিয়ার মনে মেয়েকে বাঁচানোর একটা উপায় পাওয়ার আনন্দ, আর রোজিনা বেগমের মনে এই অজানা অপরিচিত সাহায্যকারীর প্রতি এক অপ্রত্যাশিত সন্দেহ।
যে লোকটা তাদের এই সংকটের মুহূর্তে অনাকাঙ্ক্ষিত দেবদূতের মতো উদয় হয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তার মনে কি আদৌ তাদের সাহায্য করার কোনো ইচ্ছা আছে? নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে তার মনে?
হঠাৎ গাড়িটা মূল সড়ক ছেড়ে ডানদিকে একটি সরু রাস্তা ধরে নামল।
ওসমান মিয়া কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই নাকে এলো অদ্ভুত মিষ্টি একটা গন্ধ।
প্রথমে মাথা ঝিমঝিম করল।
তারপর হাত-পা ভারী হয়ে এলো।
রোজিনা কিছু বুঝে ওঠার আগেই চোখের সামনে সবকিছু দুলতে শুরু করল।
ঠিক তখনই আকাশ চিরে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল।
শেষবারের মতো সে দেখতে পেল—
লোকটার ঘাড়ের সেই বীভৎস কাটা দাগ।
"সাহায্য করতে আসা সেই অচেনা চালক আসলে কে? ওসমান আর রোজিনার ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী ঘটতে চলেছে—জানতে চোখ রাখুন আগামী বৃহস্পতিবারের পর্বে।"
#আড্ডারসায়ন #আয়ানওরক্তাক্তচোরাবালি #বাংলাথ্রিলার #রহস্যগল্প #ক্রাইমথ্রিলার #গল্পেরঝুড়ি