11/05/2024
একজন আবেগী মাওলানা ও হযরতজি ইলিয়াস (রহঃ) এর শিক্ষণীয় ঘটনা।
দিল্লীর নিযামুদ্দীন আওলিয়ার মাজার থেকে মাত্র ৩৫০ মিটার দূরত্বে বাংলাওয়ালী মসজিদ অবস্থিত।
একবার ইলিয়াস রাহিমাহুল্লাহ মার্কাজ মসজিদের গেটে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ কোত্থেকে এক মাওলানা সাহেব এসে হযরতজ্বীকে কঠোর ভাষায় শাষাতে লাগলেন।
মূল বক্তব্যটা ছিলো এরকম "আপনি কিসের দাওয়াত দেন ? কিসের তাবলীগ করেন ? আপনার মার্কাজ থেকে মাত্র ৫ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত এই নিজামুদ্দিন দরগায় রাত-দিন শিরক হয়। এগুলো ঠেকাইতে পারেন না ?" এভাবে বলতেই থাকলেন।
হযরতজ্বী সব শুনে ঠাণ্ডা মাথায় বললেন, ভাই! এটাতো আমার একার দায়িত্ব না। সবার দায়িত্ব। আপনারও। তাই না ? তো আপনি কী করেছেন ?
- কী করেছি মানে ? এখনো পাগড়ীর নিচে সেই ক্ষতচিহ্ন আছে।
- কিসের ক্ষতচিহ্ন ?
- দরগায় গিয়ে দেখলাম, এক লোক দুই হাত একত্র করে কপালে ঠুকতে ঠুকতে ঢুকছে। তাকে শক্ত করে ধরে বললাম, এখানে শিরক করতে আসছেন কেন ?
দরগাওয়ালার কোন ক্ষমতা আছে নাকি ?
আল্লাহর কাছে চাইতে পারেন না ?
বলতে যতটুকু দেরী মাত্র। সাথে সাথে আরো কয়েকজন মিলে আমাকে মাটিতে শুইয়ে এমন মারা মারলো যে, শরীরের বহু জায়গায় জখম হয়ে গেলো। মাথা ফেটে রক্তও বের হয়েছে। এখনো সেই দাগ শুকায় নি।
ঘটনা শুনে হযরতজ্বী অত্যন্ত দরদের সাথে বললেন, মাওলানা! মুসলমানের রক্ত কি এত সস্তা যে, যেখানে সেখানে আপনি সেটা অহেতুক ঢেলে দিবেন ?
দেখুন মাওলানা, এখানে যারা আসে সবাই কিন্তু বিপদগ্রস্ত। বিভিন্ন পেরেশানীতে বিপর্যস্ত হয়ে শেষ চিকিৎসা মনে করেই এখানে আসে। এই বিপদগ্রস্ত পেরেশান লোকটার শেষ ভরসার উপর আপনি যদি এভাবে আঘাত হানেন তাহলে তো হীতের বিপরীত হওয়াই স্বাভাবিক। এই যে আপনি রক্ত ঝড়ালেন। তাতে কী ফায়দা হয়েছে ?
সে কি ফিরে এসেছে ?
শিরক থেকে মুক্ত হয়েছে ?
মাওলানা নিরুত্তর। হযরতজ্বী বলেই চললেন, বরং আপনি যদি তার সাথে কুশল বিনিময় করে তাকে আপন করে নিতেন এরপর দরদ নিয়ে জিজ্ঞাসা করতেন "ভাই! আপনি কোত্থেকে এসেছেন ?
কী সমস্যা আপনার ?
কেন আসছেন ?"
তখন সে আপনাকে আপন ভেবে সব সমস্যার কথা খুলে বলতো। এবার আপনার পালা শুরু। তাকে হিকমতের সাথে বুঝিয়ে বলা যেত "ভাই! এখানে যার দরবারে এসেছেন তিনি বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদেরকে একটা গুরুত্বপূর্ণ আমল দিতেন। যদি আপনিও সেটা করতে পারেন তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তা'আলা আপনাকে বিপদমুক্ত করবেন ইনশা আল্লাহ।"
হযরতজ্বী বলেন, ঠিক এমনই এক ঘটনা ঘটেছিলো আমার সাথে। সেই ব্যক্তিতো জানার জন্য ব্যকুল হয়ে গেলো যে, কী সেই গুরুত্বপূর্ণ আমল। আমি তাকে বললাম, আমার সাথে চলুন। মার্কাজের পথে হাঁটতে হাঁটতে তাকে দাওয়াত দিতে লাগলাম, "ভাই! এই বুযুর্গতো অনেক বড় আল্লাহর ওলী ছিলেন। আল্লাহ তা'আলার সাথে তার সম্পর্ক ছিলো খুবই গভীর। তিনি দুআ করলে আল্লাহ তা'আলা সেটা মঞ্জুর করে নিতেন। আসলে সবকিছুতো আল্লাহ তা'আলাই করেন। মাখলূক তো অক্ষম। আল্লাহর হুকুমের গোলাম। তাই আমাদের উচিৎ, আল্লাহ তা'আলার সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা। তাহলে দুনিয়ার কোন বাঁধাই আমাদের সামনে টিকবে না।
কথা বলতে বলতে চলে এলাম। তাকে বললাম, আপনি গোসল করে আসেন। লুঙ্গি-গামছা এগিয়ে দিলাম। ফিরে এসে জানতে চাইলো, কী সেই আমল ? বললাম, তিনি সবাইকে দুই রাকাত (সালাতুল হাজত) নামাজ পড়তে বলতেন। এরপর কায়মনোবাক্যে খুব দুআ করতে বলতেন। আল্লাহ তা'আলার কাছে যত বিনয়ের সাথে দুআ করা যায় ততই দ্রুত কবূল হয়। বেচারা নামাজ জানতো না। তাকে নামাজ শিখালাম। এরপর জীবনের প্রথম তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড় করিয়ে দিলাম।
একটু পেছনে এসে আমিও দাঁড়ালাম আমার রবের সামনে। দু'রাকাত নামাজ পড়ে দু'হাত তুলে বললাম "আল্লাহ! তোমার এই বান্দাকে শিরকের দরবার থেকে ফিরিয়ে এনে তোমার দরবারে দাঁড় করিয়ে দিলাম। আমার দায়িত্ব এতটুকুই। বাকী দায়িত্ব এখন শুধুই তোমার।"
নামাজ শেষে বেচারা এমন কান্না আরম্ভ করলো যে, সারা জীবনের অনুযোগ যেন একসাথে পেশ করছে। তারপর অনেক লম্বা কাহিনী। সে এখন নিয়মিত মার্কাজে জুড়ে। আল্লাহ তা'আলা তার মাধ্যমে বহু লোককে এই শিরকী দরবার থেকে ফিরিয়ে এনেছেন।
কথাগুলো শুনে আবেগী মাওলানা সাহেবের বিবেক ফিরে এলো। ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেন এবং এই মোবারক দাওয়াতী কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে চলে গেলেন।
এই সেই মেহনত যা পুরা দুনিয়ায় চলছে। এই মেহনতে শরীক হলে পুরা দ্বীন সম্পর্কে সঠিক-ছহীহ বুঝ আসে।
আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকেও বিবেক খাঁটিয়ে আল্লাহর কালিমাকে সমুন্নত করার মেহনতে শামিল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।