16/04/2024
মানুষের প্রতি পবিত্র কোরআনের দাবি
আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
“একজন রাসূল, যে তোমাদের কাছে আল্লাহর সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করে; যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে যাতে তিনি তাদেরকে অন্ধকার হতে আলোতে বের করে আনতে পারেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং সৎকাজ করবে তিনি তাকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত; সেখানে তারা স্থায়ী হবে; আল্লাহ তো তাকে অতি উত্তম রিয্ক দেবেন।“ (সূরা আত-ত্বালাক-১১)
ইসলাম একমাত্র পূর্ণাংগ জীবনব্যবস্থা। আল কোর'আন এর সংবিধান। মুসলমানদের নিকট আল কোর'আনের কতগুলো মৌলিক দাবী রয়েছে। এ দাবী সম্পর্কে সচেতন না থাকার কারনে কোর'আন মজিদের সাথে মুসলমানদের ঘনিষ্টতা ক্রমেই শিথিল হয়ে আসছে, অধঃপতিত হচ্ছে মুসলিম জাতি।
প্রতিটি মুসলমানের এ দাবী সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। এ কোরআন অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করলে বিশ্ব মুসলমান আবার তাদের হারানো গৌরব ও সম্মান ফিরে পাবে কোনো সন্দেহ নেই।
প্রত্যেক মুসলমানের নিকট আল কুর'আনের রয়েছে পাঁচটি দাবী
১। মেনে নেয়া। বিশ্বাস ও সম্মানঃ
“বল, রুহুল কুদস (জীবরীল) একে তোমার রবের পক্ষ হতে যথাযথভাবে নাযিল করেছেন। যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে সুদৃঢ় করার জন্য এবং হিদায়াত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।“ (সুরা নাহালঃ ১০২)
বিশ্বাস বা মেনে নেয়ার পারিভাষিক নাম হলো ঈমান। এর আবার দু'টি দিক রয়েছে— ১. ইকরার বিল লিসান অর্থাৎ, মুখে স্বীকার করা। ২. তাসদীক বিল কাল্ব অর্থাৎ, মনে প্রাণে বিশ্বাস করা ।
২ । সহীহ শুদ্ধভাবে পাঠ করতে জানা।
“আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা তা তিলাওয়াত করে যেভাবে তিলাওয়াত করা উচিত অর্থাৎ, তিলাওয়াতের হক আদায় করে।” (আল বাকারা : ১২১ )
৩। অর্থ সহ জানা ও অনুধাবন করা।
এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি বরকত হিসেবে অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমুহ লক্ষ্য করে এবং বুদ্ধিমানগণ যেন তা অনুধাবন করে । (ছোয়াদ ৩৮:২৯)
তারা কি কোরআন সম্পর্কে গভীর চিন্তা করে না ? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ ? (মুহাম্মদ ৪৭:২৪)
৪। নির্দেশ অনুযায়ী আমল বা কাজ করা।
নিশ্চয় এ কুরআন এমন একটি পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল এবং যে মুমিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার। (ইসরা-৯)
“যারা আল্লাহর নাযিল করা আইন অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করে না, তারাই কাফের।” (আল মায়েদা: ৪৪)
৫। অন্যের কাছে আল কুর'আনের দাওয়াত পৌছে দেয়া।
‘হে আমাদের রব, তাদের মধ্যে তাদের থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যে তাদের প্রতি আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে আর তাদেরকে পবিত্র করবে। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’। (আল-বাকারা:১২৯)
“আর এই কুরআন আমার নিকট ওহীর মাধ্যমে প্রেরণ করা হয়েছে, যেন আমি তোমাদেরকে এবং যার যার নিকট এটি পৌঁছবে সকলকে সতর্ক ও সাবধান করে দেই।” (আল আনআম: ৯৯)
কুরআন শিক্ষা না করার পরিণতি
কোরআনকে যারা দূরে সরিয়ে রেখেছিল বা কোরআন থেকে দূরে সরে গিয়েছিল, তাদের প্রসঙ্গে কোরআন কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘(বিচারের দিনে) রাসুল (সা.) বলবেন, হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমার জাতি এই কোরআনকে পরিত্যাগ করেছিল।’ (সুরা-২৫ ফুরকান, আয়াত: ৩০)।
কোরআন তিলাওয়াত, অধ্যয়ন ও অনুশীলন থেকে বঞ্চিতদের সম্পর্কে হাদিস শরিফে আছে, ‘যার অন্তরে কোরআন নেই, সে যেন পরিত্যক্ত বাড়ি।’ (তিরমিজি)।
রাসূলের (সা.) অভিযোগ পেশ :
কিয়ামতের ভয়াবহ অবস্থায় আল্লাহ তাআলার অনুমতি সাপেক্ষে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মাতের জন্য শাফায়াত চাইবেন। কিন্তু যারা কুরআন শিক্ষা করেনি, কুরআনের যেসব হক রয়েছে তা আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে অভিযোগ পেশ করবেন। কুরআনে এসেছে: আর রাসূল বলবেন, হে আমার রব, নিশ্চয় আমার কওম এ কুরআনকে পরিত্যাজ্য গণ্য করেছে। (সূরা ফুরকান : ৩০)।
কিয়ামতের দিন অন্ধ হয়ে উঠবে :
“সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমিতো ছিলাম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্নণ? তিনি বলবেন, অনুরূপভাবে তোমার নিকট আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল।“ (সূরা ত্বহা : ১২৪-১২৬)।
বোবা ও বধির অবস্থায় উঠবে :
আল কুরআনে বলা হয়েছে: আমি কিয়ামতের দিন তাদেরকে সমবেত করবো তাদের মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায়, অন্ধ অবস্থায়, বোবা অবস্থায়, বধির অবস্থায়। তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম। যখন জাহান্নামের আগুন নির্বাপিত হওয়ার উপক্রম হবে আমি তখন তাদের জন্য অগ্নি আরও বাড়িয়ে দেবো। (সূরা বনী ইসরাঈল : ৯৭)।
গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া :
কুরআন শিক্ষা না করা গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার শামিল। কুরআনে বলা হয়েছে, কুরআনের মহাসত্য জানার পরেও যারা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে না, চোখ দিয়ে দেখে না, কান দিয়ে শোনে না; এরা চতুস্পদ জন্তুর ন্যায় বরং এরা তাদের চেয়েও আরো অধম ও নিকৃষ্ট এরাই হলো গাফেল। (সূরা আরাফ : ১৭৯)।
কুরআন দলিল হিসেবে আসবে :
কুরআন শিক্ষা থেকে বিরত থাকার কারণে কুরআন তার বিপক্ষের দলিল হিসেবে উপস্থিত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন: কুরআন তোমার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে দলীল হবে। (সহিহ মুসলিম- ২২৩ (৪২২); মিশকাত- ২৮১)।
জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হবে :
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কুরআন সুপারিশকারী এবং তাঁর সুপারিশ গ্রহণযোগ্য। সুতরাং যে ব্যক্তি কুরআনকে সামনে রেখে তাঁর অনুসরণ করবে, কুরআন তাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি একে নিজ পশ্চাতে রেখে দিবে, কুরআন তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।
আখেরাতে জবাবদিহি করতে হবে :
কুরআন শিক্ষায় যথাযথ ভুমিকা পালন না করলে এ বিষয়ে আখেরাতে জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, নিশ্চয় এ কুরআন তোমার জন্য এবং তোমার কওমের জন্য একটি মর্যাদাবান উপদেশ। আর অচিরেই তোমাদেরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে। (সূরা যুখরুফ : ৪৪)।
যাঁরা কোরআন শুধু তিলাওয়াত করে যাচ্ছেন, তা বোঝার ও আমল করার চেষ্টা করছেন না, তাঁদের বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যাদের তাওরাত কিতাব বহনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তারা তা প্রকৃতরূপে বহন করেনি। তাদের দৃষ্টান্ত ওই গর্দভতুল্য যে পুস্তকের বোঝা বহন করে।’ (কিন্তু তা অনুধাবন ও অনুসরণ করে না)। (সুরা-৬২ জুমআ, আয়াত: ৫)।