19/09/2025
নিজের স্বামীকে নিজেরই ঘরে তার কাজিনের সাথে অতরঙ্গ অবস্থায় দেখতে পেয়ে পায়ের তলার থেকে মাটি সরে গেল চারুলতার । চারুলতা দাঁড়িয়ে আছে ঘরের দরজার সামনে। দুপুরের আলো ফাঁক গলে ঢুকছে, অথচ তার ভেতরটা অন্ধকারে ডুবে গেছে। দরজার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত গন্ধ, পারফিউমের সাথে ঘামে মেশানো তীব্র গরম গন্ধ। বুকের মধ্যে হাহাকার নেমে এল ওর, তাও নিজেকে শক্ত রেখে হাত বাড়িয়ে এক ঝটকায় দরজাটা খুলে দিল।
চোখে সামনে যা ধরা দিল, সেটার জন্য চারু কোনোদিন প্রস্তুত ছিল না। নাম চারুলতা, বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে, ভালোবেসে বিয়ে করেছিল আরভ নামের এক যুবককে।
আরভ, চারুর জীবনের দশ বছরের সঙ্গী, বিয়ের আগে যার হাত ধরে কত স্বপ্ন এঁকেছিল চারু, সেই মানুষটি বিছানার কিনারায় দাঁড়িয়ে। শরীর থেকে জামাটা আধখোলা, মুখে চমকে ওঠার আভা। আর পাশে… স্নেহা। আরভ এর কাজিনবোন, যে হাসিমুখে প্রায়ই চারুর ঘরে আসত। স্নেহা তখন কম্বল দিয়ে নিজের অর্ধনগ্ন শরীর ঢাকার জন্য ছটফট করছে।
চারুর পা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল। বুকের মধ্যে কেমন ভাঙচুর শুরু হল—হাড়ের ফাঁকে ফাঁকে যন্ত্রণা বেজে উঠল। গলা শুকিয়ে গেল, অথচ কান্না আটকে রাখা যাচ্ছিল না। চোখে জল ভরে উঠল, সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল। শব্দ বেরোতে চাইলেও গলা দিয়ে স্বর বেরোল না।
__চারু… শোনো, এটা যেমন দেখছ তেমন কিছু না…আরভ তাড়াহুড়ো করে প্যান্ট পরতে পরতে বলল। গলায় দম বন্ধ হয়ে আসা আতঙ্কের ছাপ।
কিন্তু চারু কোনো কথা বলল না। সে কেবল ভাঙা পায়ের মতো পা টেনে বাইরে বেরিয়ে এল। দৌড়ে সিড়ি বেয়ে নিচে নামল ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই অনুভব করল, সেখানে সবাই বসে আছে—শাশুড়ি, শ্বশুর, দেবর, ননদ। সবার দৃষ্টি তার দিকে নিবদ্ধ, যেন তারা আগেই সব জানত। যেন তারা অপেক্ষা করছিল কবে চারু হোঁচট খেয়ে ভাঙবে।
চারুর শাশুড়ির মুখে একটা অদ্ভুত হাসি—ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের রেখা। সেই হাসির মধ্যে যেন লিখে রাখা ছিল: যেন আপদ বিদেয় হয়েছে উনার ঘাড় থেকে।
চারু এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। মনে হচ্ছিল পুরো দুনিয়া ঘুরছে, অথচ সে স্থির। ভেতরের ভাঙন ঢাকতে সে চোখের জল মুছে ফেলল। এবার সে আর আগের মতো ভীত, চুপচাপ মেয়ে নয়। বুকের ভেতরে এক নতুন রূপ গড়ে উঠছে—যে রূপ অপমান সহ্য করবে না।
সে সোজা বেরিয়ে গেল বাড়ির দরজা দিয়ে। বাইরে আকাশ তখন গোধূলির লালচে আলোয় ভরা, তবু তার ভেতরের আকাশ ছিল কালো মেঘে ঢাকা। রাস্তায় সো সো করে গাড়ি ছুটে যাচ্ছে, চারু মাতালের ন্যায় রাস্তায় হেটে যাচ্ছে, তো কখন হোচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছে, কিছু মানুষ অবাক চোখে ওকে দেখছে, আবার কেউ ওকে পাগল ভাবছে। তবে চারুর সেইসবে কোনো খেয়াল নেই, ওর যেন বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই মরে গেল।
কেটে গেল দুদিন,,,,
চারুলতা বসে আছে বাপের বাড়ির ড্রয়িংরুমের সোফায়। চারপাশে পরিপাটি পর্দা, দেওয়ালে পুরোনো পারিবারিক ছবি, কিন্তু আজ এই ঘরে কোনো আনন্দ নেই আছে শুধু বিষাদ।
সামনে বসে আছে আরভ, তার বাবা-মা, বোন আর পাশে স্নেহা। স্নেহার মুখে সেই একই তাচ্ছিল্যপূর্ণ হাসি—যেন সে ইতিমধ্যেই নিজের জয় উদযাপন করছে।
চারু আজ চুপচাপ, কিন্তু ভেতরে এক অদৃশ্য আগুন জ্বলছে। বিয়ের পর থেকে সে কতটা সহ্য করেছে—শ্বশুরবাড়ির মানুষদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য, গালাগাল, খোঁটা। শুধুমাত্র আরভ এর দিকে তাকিয়ে, কিন্তু আজ সেই মানুষটাই ওর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। সবসময় ও ভেবেছে, অন্তত আরভ তাকে ভালোবাসে । আজ সেই ভালোবাসাও ধ্বংসস্তূপ হয়ে গেছে।
সে গভীর শ্বাস নিল, তারপর আরভের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
__আমার সাথে এমন কেন করলে তুমি, আরভ?
ঘরে মুহূর্তের নীরবতা।
আরভ কিছু বলার আগেই শাশুড়ি খ্যাঁক করে উঠলেন,
__কি এমন করেছে আমার ছেলে হ্যাঁ? তুমি নিজেই বেশি বুঝো ।
চারুর দৃষ্টি এবার শাশুড়ির দিকে গেল। গলায় কম্পন থাকলেও কণ্ঠের দৃঢ়তা স্পষ্ট,
__আপনার ছেলে কি করেছেন আপনি জানেন না, নাকি জেনেও চোখ বন্ধ করে রেখেছেন?
শাশুড়ির মুখে উপহাসের ছায়া ঘন হল।
__এই মেয়ে, আমার ছেলে কোনো অন্যায় করেনি। ছেলেরা একটু আধটু এরকম করেই থাকে, তাতে কি হয়েছে, এটা নিয়ে এত জল ঘোলা করার কি আছে।
__জল ঘোলা আমি করছি, চরিত্র ঠিক নেই আপনার ছেলের আর আপনি বলছেন আমি জল ঘোলা করছি?
__তোমার এত সাহস তুমি আমার ছেলেকে দুশ্চরিত্রা বলছো। চরিত্রে সমস্যা তো তোমার , দু’বছর বিয়ে হয়েছে, তবু আমাদের ছেলেকে সন্তান সুখ দিতে পারলে না। আবার জোর গলায় কথা বলছো।
কথাগুলো চারুর বুকের গভীরে আঘাত করল। চোখে জল ভেসে উঠল, কিন্তু সে আজ নিজেকে দুর্বল হতে দিল না।
তার মনে পড়ল সেই সকালটার কথা—ডাক্তারের চেম্বারে বসে রিপোর্ট হাতে পাওয়ার মুহূর্ত। ডাক্তার মৃদু হেসে বলেছিলেন,
__অভিনন্দন, আপনি মা হতে যাচ্ছেন।
চারু সেই মুহূর্তে ভেবেছিল, আরভকে একটা চমক দেবে। কত স্বপ্ন জড়িয়ে ছিল সেই ছোট্ট কাগজের পাতায়। কিন্তু বাড়ি ফিরে পেল এমন এক দৃশ্য, যা তার জীবনকে ভেঙে চুরমার করে দিল।
চারু শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
__ আপনার মতো মহিলাদের কি বলা হয় আপনি জানেন তো মা? ওহ মা শব্দ টা আপনাকে বললে সেই শব্দটির অপমান করা হবে।
তখনই আরভ গর্জে উঠে দাঁড়াল,,,,,
__চারু, মুখের ভাষা সামলে তোমার এত স্পর্ধা হয় কি করে আমার মার সাথে এইভাবে কথা বলার। আমি ভেবেছিলাম তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিব কিন্তু তুমি আমার ক্ষ মার যোগ্যই না, আর হ্যাঁ আমি যা করেছি বেশ করেছি, তোমার মতো মেয়ে যে আমাকে বাবার সুখ দিতে পারলো না, তার সাথে এতদিন আমি সংসার করেছি এটাই অনেক , এখনি আমার মার কাছে ক্ষমা চাও নয়তো আমার বাড়িতে তোমার মত বন্ধার জায়গা হবে না।
চারু তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াল, চোখের পলকে ঠাস করে শব্দ হল,ঘরে হঠাৎ নিস্তব্ধতা নেমে এল।
হ্যাঁ চারু মেরেছে চ,ড় টা আরভ কে।
অনুগল্প:- চারুলতা
প্রথম পর্ব
লেখনীতে:- sanjana
চলবে।