22/06/2020
যে কোন কাজে শেষ পর্যন্ত মনোবল চাঙ্গা রাখার মাধ্যম কী?.................................................................................
পড়াশোনা সব কলেজ পর্যন্তই। ভার্সিটিতে পড়াশোনা করা লাগে না।"
কলেজ পড়ুয়াদের কিছু পাবলিক ঠিক এভাবেই জ্ঞান দিয়ে থাকে। আর আমরা সেটা প্রমাণ করে দিয়েছি।
আমাদের কেউ কেউ তো লাইব্রেরীই চিনে না (আমার নামটা সবার আগে)। পরীক্ষার আগের রাতে দেখা যায় সবগুলা আবার একসাথে জড় হয়েছে। শিট নিয়ে টানাটানি, কার কোন শিট নেই, হলগেট দৌড়াও, কপি করো।
কেউ আবার সিনিয়রদের পিছে দৌড়ায়, "ভাই একটু দেগে দেন। এত্ত কঠিন, কিচ্ছু বুঝি না!" 😣
কেউ বিকেল থেকে, কেউ সন্ধ্যায়, কেউ আবার টিউশন সেরে হলের ক্যানটিনে খাসির মাথা মুগ ডালের খানা খেয়ে সোজা গিয়ে লাইব্রেরী ঢুকে।
যার নিরবতা দরকার সে দূরের টেবিল গিয়ে একা পড়ে। বাকিরা মিলে চলে গ্রুপ স্টাডি।
সারাবছর খোঁজ নাই, পরীক্ষার আগের রাতে ঘুম নাই।
রাত বাড়তে থাকে। একে একে লাইব্রেরী থেকে অন্যেরা বিদেয় হয়, জ্ঞানপাপীদের মনোযোগ তখন আরও বেড়ে যায়।
একটানা পড়ার চোটে মাথা ভার হতে বেশিক্ষণ লাগে না। কেউ টেবিলে মাথা দিয়ে একটু ঝিমিয়ে নেয়, কেউ মাঝের ফাঁকা জায়গায় করে চলে পায়চারী।
রাত তিনটের পর আর গাড়ি আগায় না। তখন কেউ প্রস্তাব দেয়, "চল গেটে যায়, কিছু খেয়ে আসি!"
আহা! কি দারুণ প্রস্তাব!
এ সেই জ্ঞানপাপী হতে পারে, কিন্তু কথাগুলো সে বলে নাই। নিশ্চয়ই কোনো ফেরেশতা তার মুখ দিয়ে বলিয়েছে। যাই হোক, অই বান্দার জন্য দুখানা হাততালি হবে।
অতঃপর, নৌকার পাল ঘুরিয়ে গেটের দিকে নেয়া হয়।
লাইব্রেরীর গুমট আবহাওয়া থেকে বের হয়ে হলগেট পর্যন্ত যেতে যেতে মাথায় যত ভার ছিল আস্তে আস্তে নেমে যায়।
গেট পেরিয়ে রাস্তায় পা রাখতেই মাঝ রাতের হাওয়ারা ছুঁয়ে যায়। কি যে প্রশান্তি!
মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে ছুটে চলা ট্রাকের গুড়গুড় আওয়াজ শোনা যায়।
গরম তেলে পরাটা ভাজার শব্দ রাস্তার এপার থেকেও পাওয়া যায়। মগের মধ্যে ডিম ভাঙছে হোটেলের বাবুর্চি।
"মামা, পরাটা আর লটপটি, সাথে মুরগীর ঝোল" (লটপটি—ডিম ও সবজির একটি মিক্সড আইটেম)
খাওয়া চলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধও চলে। ক্যাম্পাস রাজনীতি থেকে বলিউড, হলিউড, প্রেমে অপটু বন্ধুর তুলোধুনো, কোনকিছুই সে যুদ্ধের ময়দানে রেহাই পায় না।
এখন যদি সেই ফেরেশতা এসে জিজ্ঞেস করে, "কাল কোন কোর্সের এক্সাম রে?"
আমি হলপ করে বলতে পারি পরাটার টুকরা এদের গলায় বাধতে বাধ্য।
হোটেলের বিল চুকিয়ে কেউ কেউ গরুচোরের মতো খুঁজতে থাকে সিগারেট মামা কই!
যারা ধোঁয়া খায় না, তাদের জন্য ঠান্ডার বন্দোবস্তো করতে আবার ভোলে না। ইনসাফ! ইনসাফ! চোর হলেও ইমান আছে।
দলা দলা কোকাকোলা গলা বেয়ে যখন নামতে থাকে তখন অতৃপ্ত আত্মারাও যেন তৃপ্ত হয়ে যায়।
ফেরেশতা এতক্ষণে হাঁফ ছেড়ে বলে, "হু, তোদের করাতে ধার দেয়া শেষ, এবার তোরা টাইটানিক উদ্ধারের জন্য তৈরি!"
লাইব্রেরী ফিরে গিয়ে চলে কালকের পরীক্ষার দফারফা করার প্রস্তুতি।
অনার্স লাইফে পরীক্ষার আগের রাতগুলোর চিত্র ঠিক এমনই ছিল।
সারাবছর পড়াশোনা কিছু করা হয় নি, পরীক্ষার আগের রাতে তাই চাপটা অনেক বেশি। এই এত্ত চাপ অবশ্য রাতভর পড়ার জন্য মনোযোগ ধরে রাখতে খুব কাজে দেয়।
কিন্তু কতক্ষণ আর একটানা মনোবল ধরে রাখা যায়?
শরীরের বিশ্রামের পাশাপাশি মগজেও একটু শান দেয়া দরকার।
ড. স্টিভেন কোভে হাতে কলমে শিখিয়ে দিয়েছেন কিকরে তা করা যায়। "দ্য সেভেন হ্যাবিটস অফ হাইলি ইফেক্টিভ পিপুল" বইতে ড. কোভের বলা সাত নম্বর অভ্যাসটি হচ্ছে —Sharpen The Saw. যাকে বাংলায় বলছি—করাতে ধার দেয়া।
আপনার সবথেকে বড় সম্পদ হচ্ছেন আপনি। শার্পেন দ্য স' মানে হলো এই সম্পদকে সংরক্ষণ করা এবং বাড়িয়ে চলা। জীবনের ৪টি ক্ষেত্রে স্ব-নবায়নের ভারসাম্য রেখে এগিয়ে চলা : শারিরীক, মানসিক, আধ্যাত্মিক এবং সামাজিক/ইমোশনাল।
প্রতি ক্ষেত্রের কিছু উদাহরণ হলো :
শারীরিক : স্বাস্থ্যকর খাওয়া, ব্যায়াম, বিশ্রাম।
সামাজিক/ইমোশনাল : অন্যদের সাথে অর্থপূর্ণ ও সামাজিক সংযোগ স্থাপন।
মানসিক : শেখা, পড়া, লেখা, অন্যকে শেখানো।
আধ্যাত্মিক : প্রকৃতির মাঝে সময় কাটানো, মেডিটেশন, মিউজিক, আর্ট, প্রার্থনা বা সেবা দান করা।
যেকোনো কাজে শেষ পর্যন্ত মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য আপনাকে মাঝে কয়েকবার বিরতি টেনে করাতে ধার দিয়ে নিতে হবে।
আমার গল্পটাতে দেখবেন আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে খেতে গেছি, হাঁটাচলা করেছি। এগুলো ছিল শারীরিক দিক।
আমরা কয়েকজন বন্ধুরা একসাথে গেছি, পড়াশোনার বাইরে অন্য বিষয়ে কথাবার্তা বলে সময় কাটিয়েছি যেগুলো ইমোশনাল দিকটাকে পূর্ণ করেছে।
ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গায়ে রাতের স্নিগ্ধ হাওয়া মেখে কিছুটা সময় কাটানো আমাদের আধ্যাত্মিক দিকের অনেকটায় পূরণ করেছে।
অল্প হলেও একটু থেমে আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ- নিজেদেরকে যতটুকু নবায়ন করে নিতে পেরেছি তাতেই আমাদের শেষ পর্যন্ত পৌছানোর মনোবল আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।
তেল ফুরানোর আগেই তেল নিলে তবেই না গাড়ি আবার ফুলস্পিডে দৌড়াবে!
আব্রাহাম লিংকন যেমন বলেছেন, "আমাকে একটি গাছ কাটার জন্য ৬ ঘণ্টা দিলে, আমি প্রথম ৪ ঘণ্টা ব্যয় করব করাত ধার দিতে।"
মনোবল চাঙ্গা রেখে আপনার মঞ্জিল পর্যন্ত পৌঁছাতে নিজের করাতে ধার দিয়ে নিতে ভুলবেন না।