25/07/2025
বইয়ের নাম: বাঙালি মসুলমানের মন
লেখক: আহমদ ছফা
আহমদ ছফা একজন গবেষকধর্মী লেখক ছিলেন ৷ তিনি তার রচনায় এমন কোন বাক্য লিখেন নি, যা অপ্রয়োজন ৷ তার লিখা আমার এ কারণে ভালো লাগে ৷ স্বাধীনতা পরবর্তী যে কয়েকজন লেখক তাদের শক্তিশালি লেখুনির মাধ্যমে মহীরূহ হয়েছেন, আহমদ ছফা তাদের ভেতর একজন ৷ 'বাঙালি মসুলমানের মন' এ গ্রন্থটিকে প্রবন্ধ গ্রন্থ বলা যেতে পারে ৷ এ বইটিতে ১৩ টি অধ্যায় আছে ৷ এর প্রত্যেকটি গবেষণাধমী বলা যেতে পারে ৷ তবে এ ১৩ টি রচনার ভেতর অন্যতম একটা হলো— 'বাঙালি মসুলমানের মন' আর এ প্রবন্ধটি পুরো বইয়ের প্রাণ ৷ হয়তবা, এ কারণে ঐ অধ্যায়টির নামানুসারে বইটার নামকরন করা হয়েছে —
'বাঙালি মসুলমানের মন'
এ বইটির একটা অধ্যায়ের সারকথা আমি বলবো ৷ আহমদ ছফা বাঙালি মনকে বুঝতে চেয়েছেন ৷ আর তাই তিনি বাঙলা পুঁথি-সাহিত্যের দিকে নজর দিয়েছিলেন ৷ বাঙলা পুঁথি-সাহিত্যিকরা ইসলামের প্রাথমিক যুগে বীরদের বিজয় বর্ণনার সাথে রসাত্মক ব্যাপার জুড়ে দিয়েছেন ৷ এ সকল চরিত্যের ঐতিহাসিক সত্যগুলোকে সম্পূর্ণ খেলাপ করে নিজের মতো করে বর্ণনা করেছেন ৷ কল্পিত এ সকল বর্ণনার পেছনে ছিলো ঐতিহাসিক সামাজিক সংঘাত,পরিবেশ ও সমাজ ৷
এ দেশের নিম্নবর্ণের হিন্দুরা আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে নিপীড়িত ছিলো ৷ এ নিপীড়ন থেকে মুক্তির আশায় তারা প্রথমে বৌদ্ধ ও পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিলো ৷ ইসলামধর্ম গ্রহন ছিলো নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর মুক্তির একটা ব্যবহারিক পদক্ষেপ ৷ নির্যাতিত ও নিপীড়িত এ জনগোষ্ঠী পূর্বের সমাজের ঐতিহ্য গ্রহন করতে পারে নি আবার ইসলামি সমাজ ও সংস্কৃতির উন্নত ও আদর্শ ঐতিহাসিক কারণে অধিকার করতে পারে নি ৷ ফলে এ অনগ্রসর মুসলিম জনগোষ্ঠী ইসলামের নামে যে সকল কাহিনী চাইতেন, সে সকল কাহিনী পুঁথি লেখকদের শোনাতে হতো ৷ আর এ পুঁথি লেখকরা ছিলো এ জনগণেরই কণ্ঠ ৷
আহমদ ছফার মতে এ কারণে বাঙলা পুঁথি সাহিত্যে উদ্ভট রসের এতো বেশি ছড়াছড়ি ৷ হিন্দু পুরাণ ও মহাকাব্যে বীর-বীরাঙ্গনাদের চরিত্রের বিকৃত রূপই মুসলিম কবিদের সৃষ্ট বীরদের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ৷ নতুন করে জীবন লাভ করেছে ৷ এরই একটা বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে প্রখ্যাত লেখক মীর মশারফ হোসেনের 'বিষাদ সিন্ধু' উপন্যাসে ৷ এ উপন্যাসে ব্রাহ্মণ আজর চরিত্রটি এ সত্যকে গ্রহন করে দাঁড়িয়ে আছে ৷ অথচ এ বিস্তর মরু প্রান্তরে ব্রাহ্মণ থাকার কথাই না ! সময়ের পালা বদল এ শক্তিশালী লেখকের মনে কোন আঁচড় কাটতে পারে নি ৷ পুঁথি লেখকদের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকান্ডকে মীর মশারফ হোসেন নির্বিবাদে মেনে নিয়েছিলেন ৷
ভারতে ইসলাম প্রচারে সুফি-দরবেশদের গৌণ ভূমিকা ছিলো, সেই সাথে খিলজি, লোদী ও চেঙ্গিস খানের বংশধরদের সাম্রাজ্য বিস্তারই ছিলো ইসলাম প্রসারের মুখ্য কারন ৷ এ কথা সত্য, মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের প্রভাব ইউরোপীয়দের রেঁনেসাকে ত্বরান্বিত করেছিলো তথাপি ভারতবর্ষের মাটিতে সে যুক্তিবাদী চিন্তাধারা একেবারেই শিকড় বিস্তার করতে পারে নি ৷ ভারতের লক্ষৌ, দিল্লীতে ইসলামের যেটুকু ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ হয়েছে, বাংলার মাটিতে তার ছিটেফোটাও পৌছাতে পারে নি ৷ যে মুসলিম শাসকগোষ্ঠী বাংলা শাসন করতো, তারা স্থানীয় মুসলিম জনগনের সাথে সম্পর্ক রাখতেন না ৷ তারা অনেকটা ইউরোপীয় শাসকদের মতো বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতেন ৷ এ মুসলিম শাসক শ্রেণীটি যে শ্রেণীটির মাধ্যমে বাংলা শাসন পরিচালনা করতো তারা প্রায় সকলেই ছিলো উচ্চবর্ণের বাঙালি ব্রাহ্মণ, কায়স্থ বা বৈশ্য ৷ যখনই প্রয়োজন পড়েছে তারা পদবী প্রদান করে আরেকটি নেতৃ শ্রেণী তৈরি করেছে ৷ এ রকম কিছু পদবীর উদাহরণ হলো— দেওয়ান, বখসী, মুন্সি ও দস্তিদার ইত্যাদি ৷ বাংলার তথাকথিত এ মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে মুসলিম শাসক শ্রেণীকে প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করার সুযোগ ছিলো খুবই কম ৷
মুসমিল শাসক শ্রেণীটি এদেশের প্রশাসনিক সমাজ কাঠামোতে খুব কমই পরিবর্তন এনেছিলো ৷ যতোটুকু পরিবর্তন এনেছিলো, যতোটা তাদের দরকার ছিলো ৷ এ দেশের সমাজ কাঠামোকে তারা নির্বিবাদে মেনে নিয়েছিলো ৷ মুসলিম শাসক শ্রেণীটি পূর্বের শাসক নেতৃশ্রেণীর শূণ্যস্থানটি পূরণ করেছিলো মাত্র ৷ খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, যারা প্রশাসনিক কারণে ফার্সি ভাষা শিখেছিলেন তারা অধিকাংশই ছিলো উচ্চবর্ণের হিন্দু লোকজন ৷ ফলে বাঙালি মসুলমানদের অবস্থা, রুচি ও পেশার পরিবর্তন হয় নি ৷ মসুলমানরা এদেশের শাসক শ্রেণীর পদটা দখল করার কারণে স্থানীয় মসুলমানরা আত্মতৃপ্তি ছাড়া ইসলাম কিংবা আর্য সংস্কৃতির কিছুই লাভ করতে পারে নি ৷ সংখ্যার দিক থেকে মসুলমানেরা ছিলো অধিক আর উৎপাদন পদ্ধতির সাথে তাদের সরাসরি সম্পর্ক ছিলো ৷ শাসকশ্রেণী বিভিন্ন সময়ে তাদের প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শন করতো ৷ ফলে আপামর বাঙালি মসুলমানদের ভেতর দ্রুত সামাজিক আকাঙ্খা জন্ম লাভ করেছিলো ৷ যা পুঁথি সাহিত্যের ভেতর প্রকাশিত হয়েছে ৷
মুসলিম যে শাসক শ্রেণীটা ছিলো তারা ছিলো বিদেশী, স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের যোগাযোগ ছিলো না ৷ ইউরোপীয় শাসক গোষ্ঠীর মতো বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতো ৷ সাংস্কৃতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য তারা দিল্লি ও মধ্য প্রাচ্যের দিকে চেয়ে থাকতো ৷
ভারতের হিন্দুরা বড় আশ্চর্য জাত ৷ তারা দরবারে প্রশাসনাক কাজ করার জন্য ফারসি ভাষা শিখলেও, নিজের ভাষা বাদ দিয়ে কখনও এ ভাষা গ্রহণ করে নি ৷ সুতরাং ভারতে ফার্সি ভাষা ছিলো আপামর জনগনের স্পর্শ বর্জিত অভিজাত শ্রেণীর ভাষা ৷ স্থানীয় অভিজাত শ্রেনীর ভেতর এ ভাষার বিকাশ ও প্রসার ঘটে নি ৷ ভারতীয় মসুলমানরা নিজেদের প্রয়োজনে ফার্সি বর্ণমালা ও ভারতীয় অন্যান্য ভাষার সমন্বয়ে পাঁচমেশালী উর্দু নামে একটি ভাষা তৈরি করেছিলো ৷ ভারতীয় মসুলমানদের কাছে উর্দু ও ফার্সি এ দুটো ভাষাই পবিত্র ছিলো ৷ এ দুটো ভাষাকে রপ্ত করার জন্য যে আর্থিক ভিত্তি ও সাংস্কৃতিক বুনিয়াদ থাকা দরকার ছিলো তা এ দেশের মসুলমানদের ছিলো না ৷
পলাশী যুদ্ধে পরাজয়ে মসুলমানরা একেবারে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিলো তা সম্পূর্ণ সঠিক না ৷তবে নেতৃ স্থানীয় শাসক শ্রেণিটির দুর্দশার কোন অন্ত ছিলো না ৷ তারা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারে নি ৷ ফলে ব্রিটিশদের সাথে তাদের যেমন সম্পর্ক ছিলো না তেমন স্থিনীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীকে তারা নেতৃত্ব দিতে পারে নি ৷ বলা যেতে পারে তারা বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করছিলো ৷ অন্যদিকে যারা উচ্চবর্ণের হিন্দু, শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তন তাদের মানসিকতার কোন পরিবর্তন করে নি ৷ ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে তারা অনায়াসে খাপ খাওয়াতে পেরেছিলো ৷ তারা বিদেশী শিক্ষা লাভ করে প্রশাসনিক কাজে অংশগ্রহন করে ব্রিটিশদের সাথে সম্পর্ক রেখেছিলো ৷ যেমনটা তারা মুসলিম শাসকদের সাথে রেখেছিলো ৷
বাঙালি মসুলমানরা পূর্ব হতেই নির্যাতিত এক জনগোষ্ঠী ৷ হিন্দু ধর্মের আগমনে তাদের বাধ্য হয়েই ধর্মান্তরিত হতে হয় ৷ হিন্দুদের বর্ণ প্রথার নিষ্পেষণে তাদের নির্যাতনের শিকার হতে হয় ৷ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রণয়নে তাদের কোনও ক্ষমতা ছিলো না ৷ পরে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করে পাশবিক আর্য শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিয়েছিলো ৷ নব ধর্মে দীক্ষিত হবার পরপরই এ দেশে মুসলিম রাজশক্তির বিকাশ ঘটে ৷ তখন তারা সংকুচিত এ পরিবেশ থেকে উত্তরণের জন্য তথা জীবন-মাল রক্ষা করার জন্য দলে দলে ইসলাম ধর্মের আশ্রয় গ্রহন করে ৷ বিস্তারিত ও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বলা যায়, হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথায় এদেশে সাম্প্রদায়িকতার আদিম উৎস ৷ অনেকে মনে করেন,ব্রিটিশরা এদেশে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়েছে ৷ এক্ষেত্রে সময়টাকে কম ধরে এর সূত্র খোঁজেন ৷ এর উৎস খুঁজতে হলে, ব্রিটিশদের ২০০ বছরের সময়টাকে অতিক্রম করে খুঁজতে হবে ৷
বারবার ধর্ম পরিবর্তন করলেও বাইরের পরিবর্তন ছাড়া বাঙালি মসুলমানদের বিশ্বাস ও মানসিক অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় নি ৷ কতো রাজশক্তি পরিবর্তন হলো, কতো সময় অতিবিহিত হলো কিন্তু মনের দক দিয়ে তারা অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মতো বিচ্ছিন্ন থেকে গেছে ৷ ভাষাগত, রুচিগত, সংস্কৃতিক দূরত্বের জন্য শাসক শ্রেনীর অভ্যাস ও মনন রপ্ত করতে গিয়ে তারা বারবার ব্যর্থ হয়েছে ৷ ব্রিটিশ শাসনামলে মুসলিমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দুটি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলো ৷ আর এদের সিংহভাগই কৃষকশ্রেনী ৷ এ আন্দোলনগুলো হলো— তিতুমীরের ওয়াহাবী আন্দোলন আর হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন ৷ এ আন্দোলন দুটিতে নেতৃত্বদানকারী মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর কোন সম্পর্ক ছিলো না ৷ নিচুতলার কৃষক জনগণকে একত্রিত করার একমাত্র শক্তিছিলো— ধর্ম ৷
বাঙালি মসুলমান এখনও আদিম অবস্থায় আছে ৷ দীর্ঘকাল ব্যাপী ঐতিহাসিক নিষ্পেষনে থাকার কারণে তাদের মনে একটা গভীর দাগ পড়েছে ৷ যার কারণে তারা বারবার নিজেদের রঙ পরিবর্তন করেছে কিন্তু মনের রঙটি পরিবর্তন করতে বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে ৷ হয়তবা ভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় !