19/02/2026
আয়াত: یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الصِّیَامُ کَمَا کُتِبَ عَلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ ۙ
অনুবাদ: হে মুমিনগণ! তোমাদের প্রতি রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল, যাতে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া সৃষ্টি হয়।
তাফসীর: হে ঈমানদারগণ ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ তোমাদের পূর্ববর্তী (জাতিসমূহের) লোকদের উপর ফরয করা হয়েছিল, এই আশায় যেন তোমরা (রোযার কল্যাণে ধীরে ধীরে) পরহেযগার হতে পারে। (কেননা রোযা রাখার ফলে নফসকে তার বিভিন্নমুখী প্রবণতা থেকে সংযত রাখার অভ্যাস গড়ে উঠবে, আর এ অভ্যাসের দৃঢ়তাই হবে পরহেযগারীর ভিত্তি। সুতরাং) গণনার কয়েকটা দিন রোযা রাখ। (এ অল্প কয়টি দিনের অর্থ—রমযান মাস, যা পরবর্তী আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।) অতঃপর (এর মধ্যেও এমন সুযোগ দেওয়া হয়েছে যে,) তোমাদের মধ্যে যারা (এমন) অসুস্থ হয়, (যার পক্ষে রোযা রাখা কঠিন কিংবা ক্ষতিকর হতে পারে) অথবা (শরীয়তসম্মত) সফরে থাকে, (তার পক্ষে রমযান মাসে রোযা না রাখারও অনুমতি রয়েছে এবং রমযান ছাড়া) অন্যান্য সময়ে (ততগুলো দিন) গণনা করে রোযা রাখা (তার উপর ওয়াজিব)। আর (দ্বিতীয় সহজ পদ্ধতিটি, যা পরে রহিত হয়ে গেছে, তা এরূপ যে,) এ রোযা যাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টকর মনে হয় তারা এর পরিবর্তে (শুধু রোযার) ফিদইয়া’ (অর্থাৎ বদলা) হিসাবে একজন দরিদ্রকে খাদ্য খাওয়াবে (অথবা দিয়ে দেবে)। তবে যে ব্যক্তি খুশির সাথে (আরো বেশি) খয়রাত করে (অর্থাৎ আরো বেশি ফিদইয়া দিয়ে দেয়) তবে তা তার জন্য আরো বেশি মঙ্গলকর হবে এবং (যদিও আমি এরূপ অবস্থায় রোযা না রাখার অনুমতি দিয়েছি, কিন্তু এ অবস্থাতেও) তোমাদের পক্ষে রোযা রাখা অনেক বেশি কল্যাণকর, যদি তোমরা (রোযার ফযীলত সম্পর্কে) জানতে পার।
صوم -এর শাব্দিক অর্থ বিরত থাকা বা বেঁচে থাকা। শরীয়তের পরিভাষায় খাওয়া, পান করা এবং স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার নাম ’সওম’। তবে সুবেহ্ সাদিক হওয়ার পূর্ব থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে একাধারে এভাবে বিরত থাকলেই তা রোযা বলে গণ্য হবে। সূর্যাস্তের এক মিনিট আগেও যদি কোন কিছু খেয়ে ফেলে, পান করে কিংবা সহবাস করে, তবে রোযা হবে না। অনুরূপ উপায়ে সব কিছু থেকে পূর্ণ দিবস বিরত থাকার পরও যদি রোযার নিয়ত না থাকে তবে তা রোযা হবে না।
সওম বা রোযা ইসলামের মূল ভিত্তি বা আরকানের অন্যতম। রোযার অপরিসীম ফযীলত রয়েছে, যা এখানে বর্ণনা করা অপ্রাসঙ্গিক।
পূর্ববর্তী উম্মতের উপর রোযার হুকুমঃ মুসলমানদের প্রতি রোযা ফরয হওয়ার নির্দেশটি একটি বিশেষ নযীর উল্লেখসহ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশের সাথে সাথে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, রোযা শুধু তোমাদের প্রতিই ফরয করা হয়নি, তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের উপরও ফরয করা হয়েছিল। এর দ্বারা যেমন রোযার বিশেষ গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে, তেমনি মুসলমানদের এ মর্মে একটি সান্ত্বনাও দেওয়া হয়েছে যে, রোযা একটি কষ্টকর ইবাদত সত্য, তবে তা শুধু তোমাদের উপরই ফরয করা হয়নি, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোর উপরও ফরয করা হয়েছিল। কেননা সাধারণত দেখা যায়, কোন একটা ক্লেশকর কাজে অনেক লোক একই সাথে জড়িত হয়ে পড়লে তা অনেকটা স্বাভাবিক এবং সাধারণ বলে মনে হয়। (রূহুল মা’আনী)
কোরআনের বাক্য الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ অর্থাৎ যারা তোমাদের পূর্বে ছিল ব্যাপক অর্থবোধক । এর দ্বারা হযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে হযরত মুহাম্মদ (সা) পর্যন্ত সকল উম্মত এবং শরীয়তকেই বোঝায়। এতে বোঝা যায় যে, নামাযের ইবাদত থেকে যেমন কোন উম্মত বা শরীয়তই বাদ ছিল না, তেমনি রোযাও সবার জন্যই ফরয ছিল।
যাঁরা উল্লেখ করেছেন যে, مِنْ قَبْلِكُمْ বাক্য দ্বারা পূর্ববর্তী উম্মত ’নাসারা’দের বোঝানো হয়েছে, তাঁরা বলেন—এটা উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা হয়েছে; অন্যান্য উম্মতের উপর রোযা ফরয ছিল না, তাদের কথায় এ তথ্য বোঝায় না। —(রূহুল মা’আনী)
আয়াতের মধ্যে শুধু বলা হয়েছে যে, “রোযা যেমন মুসলমানদের উপর ফরয করা হয়েছে, তেমনি পূর্ববর্তী উম্মতগণের উপরও ফরয করা হয়েছিল; একথা দ্বারা এ তথ্য বোঝায় না যে, আগেকার উম্মতগণের রোযা সমগ্র শর্ত ও প্রকৃতির দিক দিয়ে মুসলমানদের উপর ফরযকৃত রোযারই অনুরূপ ছিল। যেমন রোযার সময়সীমা, সংখ্যা এবং কখন তা রাখা হবে এসব ব্যাপারে আগেকার উম্মতদের রোযার সাথে মুসলমানদের রোযার পার্থক্য হতে পারে, বাস্তব ক্ষেত্রে হয়েছেও তাই । বিভিন্ন সময়ে রোযার সময়সীমা এবং সংখ্যার ক্ষেত্রে পার্থক্য হয়েছে। —(রূহুল মা’আনী)
তাফসীরে মাআ'রিফুল কুরআন।
রেফারেন্স: সূরা বাকারা, আয়াত নং: ১৮৩