08/01/2024
'আমি পাশ করেছিলাম বুয়েট থেকে। চাকরি করতাম সরকারের রোডস অ্যান্ড হাইওয়ে ডিপার্টমেন্টে। জায়গাটা উপরি কামাইয়ের খনি. আর আমিও ছিলাম টাকার পাগল। ঠিকাদারেরা বস্তা ভরে টাকা আনত, সেসব টাকা নিজের নামে ব্যাংকে রাখা যেত না। তবে আমি অনেকের চেয়ে বেশি স্মার্ট ছিলাম। হুন্ডির মাধ্যমে সেসব টাকা পাঠিয়ে দিতাম আমেরিকা, কানাডা এবং দুবাইয়ে। আমি সেই ইনকামের একটা টার্গেট লিমিট তৈরি করেছিলাম, কারণ আমি জানতাম এটার একটা শেষ আছে। যেকোনো একটা ভুল করে ধরা পড়ে যেতে পারি। সেই ভুলের কাছে পৌঁছার আগেই আমাকে আমার কাঙ্ক্ষিত সম্পদ অর্জন করে ফেলতে হবে।
আমি দেশে থাকতাম ভাড়া বাড়িতে, আর টাকা জমাতাম বিদেশে, ফলে আমার আয়-ব্যয়ের হিসাবে কোনো গন্ডগোল হতো না। ডিপার্টমেন্টে আমার রেপুটেশন ছিল এক্সিলেন্ট। টাকা খুব গরম জিনিস, এটা যেকোনো শীতল ব্যক্তিকে গরম করে ফেলে। সেই গরম তাকে ভোগী ও ভোক্তা বানিয়ে ফেলে। ফলে সে কিনতে থাকে একের পর এক বাড়ি, প্লট, ফ্ল্যাট, অলংকার, আরও খরচ করার জন্য ঘনঘন বিদেশ যায়। সবার নজরে পড়ে, এই নজরটাও সে উপভোগ করে, তারপর সে ধরা পড়ে। আমি এসব বুঝতাম, তাই আমি কোনো কাঁচা কাজ করিনি। আমি জানতাম মানুষের অসীম চাহিদার কথা, অসীম ক্ষুধার কথা। তাই আমি ছিলাম সবার চেয়ে স্মার্ট। দেশে বিশ বছর চাকরি করে বিদেশে ২০০ কোটি টাকার সম্পদ জমিয়েছিলাম। অথচ কেউ কিছুমাত্রও সন্দেহ করতে পারেনি।
টাকা জমানো আর পাচার করার একটা ক্লাসিক্যাল সিস্টেম আমি তৈরি করে ফেলেছিলাম। আমি মানবীয় লোভের গতি-প্রকৃতি বুঝতাম আর পাশাপাশি ছিলাম মেধাবী। ফলে টাকা আমার মাথা গরম করতে পারেনি। এই কম্বিনেশনটা খুবই দুষ্প্রাপ্য, আমিই ছিলাম সেই জিনিস।
আমি দুই হাজার কোটি টাকা সহজেই বানাতে পারতাম, কিন্তু আমি নিজের ওপর একটা লিমিট নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম, সেটাই স্মার্টনেস।
আমার একটা সুন্দরী বউ ছিল। আমার সবকিছুর খবর একমাত্র সে-ই জানত। আমার এত টাকা ছিল অথচ সেও কোনো বাড়তি শাড়ি, গহনার আবদার করত না। কারণ আমি তাকে শিখিয়েছিলাম মানবীয় লোভের গতি-প্রকৃতি। আমরা ভোগ আর জীবনকে উপভোগ করার জন্য সময় নির্ধারণ করে রেখেছিলাম। আমরা পরস্পরকে জান দিয়ে ভালোবাসতাম। আমরা আমাদের অনাগত সুন্দর দিনের গল্পে মশগুল থাকতাম। চারটি ঋতু আমরা কাটাব পৃথিবীর চার প্রান্তে, সামারে কানাড়ার ভ্যাকুভার, ফল এ আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া, শীতে দুবাই, আর বর্ষায় বাংলাদেশে আমাদের খামারবাড়িতে। এই সব স্বপ্নের মধ্যেই আমার বউয়ের পেটে বাচ্চা আসে। আহা সেইসব দিনের স্বপ্নরা শুধু উড়ছে না; বরং ঝড়ো বাতাসের মতো উড়ছে। আলট্রাসনোতে জেনেছিলাম, উড়ছে আমরা দুজনেই মেয়েই চেয়েছিলাম। আর সেটাই আসছে! আমি তার একটা নাম রেখেছিলাম। তার জন্য কত কী যে কিনেছিলাম! দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত গাইনকোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে, দেশের সবচেয়ে দামি হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম আমার বউকে। অনেক দামের বিনিময়ে, নির্ধারিত দিনের দশ দিন পর আমার সেই মেয়েটা পৃথিবীতে এলো। তাকে জন্ম দিতে গিয়ে তার মা মরে গেল। আর শিশুটা মারা গেল আরও ১৫ দিন পরে।
আমার জমানো ২০০ কোটি টাকা, আমার স্মার্টনেস, আমার ভালোবাসা কোনোকিছুই কোনো কাজে লাগেনি। আর এসব দাম দিয়ে আমিও শিখলাম কোনোকিছুই আমার কন্ট্রোলে নেই, ছিলও না কখনো। অথচ আমি সব সময় ভেবে এসেছিলাম উলটোটা।
এরপর খোঁজা শুরু করলাম, এই সবকিছু আসলে কন্ট্রোল করে কে? আমি
বুয়েটে থাকতে সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। নাস্তিক টাইপের ছিলাম। চিন্তায় সেটাই ছিল প্রগতিশীলতা। পরিবার আত্মীয়স্বজনের সাথে মিলে ঈদগাহে গিয়ে দুই ঈদের নামাজ পড়তাম। সেটা পড়তাম ঐতিহ্য এবং কালচার হিসেবে, কোনো ধর্মীয় কারণে না।
আমি বুঝেছিলাম পৃথিবীর কোনো স্থান, কাল, পাত্রের কোনো ক্ষমতা নেই আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার, আমাকে শান্তি দেওয়ার। আমি কোথাও সুস্থির হয়ে বসে থাকতে পারতাম না। অসহ্য কষ্ট আমাকে হাইপার করে রাখত। কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য আমি হাঁটতাম। ঘুম ভাঙার পর থেকে হাঁটতে শুরু করতাম, সারা ঢাকা শহর হেঁটে বেড়াতাম। গাবতলি থেকে চানখারপুর, সেখান থেকে সদরঘাট, বাবুবাজার, যাত্রাবাড়ি। নির্দিষ্ট কোনো রোেড ছিল না। ঘর থেকে বের হয়ে একদিকে হাঁটা শুরু করতাম আর রাত গভীরে ফিরে আসতাম। সারাদিন আমি আসলে শরীরের ভেতরে ক্লান্তি জমাতাম, এত ক্লান্তি, এত ক্লান্তি, যাতে আমি বিছানায় পড়ার সাথে সাথেই ঘুমিয়ে যেতে পারতাম। সেই ঘুমও ছিল তন্দ্রার মতো, কিছুক্ষণ পরপরই ভেঙে যেত, তখন আমি রুমের মধ্যে পায়চারী করতাম। এভাবেই চলছিল দিনের পর দিন।
একদিন ফুটপাত ধরে হাঁটছি, পুরানো সস্তা বইপত্রের পসরা নিয়ে বসে আছে এক হকার। কী মনে করে সেখানে দাঁড়িয়ে বইয়ের স্তূপের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। সেই স্তূপের ভেতরে একটা বই আমার নজর কাড়ল। বঙ্গানুবাদে আল কোরআন। বইটা হাতে নিয়ে খুলেই একটা লাইনে চোখটা আটকে গেল- “নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি।”
লাইনটা পড়েই বইটা বন্ধ করে আবার হাঁটা শুরু করলাম। একটা নতুন সারাদিন লাইনটা মাথায় ঘোরা ভ্রমসন হার্ডডিস্কের মধ্যে একটা ভাইরাস ঢুকে পড়েছে। তীব্র কষ্ট পাওয়া একটা। মানুষের মাথার ভেতরে অনবরত একটা রেকর্ড বাজছে-“নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি।”
দীর্ঘ এক সপ্তাহ এই নতুন যাতনা বয়ে বেড়িয়েছি। এরপর থেকে দেখি আমার হাঁটার রুট ফিক্সড হয়ে গেছে। আমি সেই ফুটপাতটা ক্রস করে যাই, যেখানে বইটা হাতে নিয়েছিলাম। আমি নাস্তিক, ওসবে আমার বিশ্বাস নেই, কিন্তু মাথার মধ্যে ভাঙা রেকর্ডের মতো বেজেই চলছে-“নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি।” আমি এমন পরিবারের সন্তান, যেখানে ধর্মকর্ম কোনো সিরিয়াস বিষয় ছিল না। যার যেমন ইচ্ছা তেমন পালন করতে পারত। আমরা সিরিয়াস ছিলাম
একাডেমিক পড়াশোনা আর ক্যারিয়ার নিয়ে।
আমাদের বাড়িতে কোরআন-হাদিসের চেয়ে গীতাঞ্জলি আর সঞ্চয়িতার কদর
ছিল বেশি। আমার বাবা-মার সকাল শুরু হতো রবীন্দ্রসংগীত শুনে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়-এসব রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীর নাম আমাদের মুখে মুখে থাকত। স্কুলে ধর্মশিক্ষা পড়তাম বেশি নম্বর তোলার জন্য, ব্যাস। এরপর ইউনিভার্সিটির জীবনে জানলাম-ধর্ম হচ্ছে আফিম, প্রগতির অন্তরায়। সেই মানুষের মাথার মধ্যে এখন অনর্গল বাজছে-“নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি।” এই যাতনা থেকে মুক্তির একটাই উপায় আছে আর সেটা হলো, বাকি কথাগুলো জানা। আমি সেই দোকানে আবার গেলাম, বইটা তখনও বিক্রি হয়নি। মাত্র ২০ টাকা দিয়ে সেই পুরানো ছেঁড়াফাটা বঙ্গানুবাদে আল কোরআন বইটা কিনে নিয়ে এলাম রমনা পার্কে। পার্কের সবুজ ঘাসে বসে খুঁজতে শুরু করলাম সেই লাইনটা। সেটা আর খুঁজে পাই না, কিন্তু আমি নিশ্চিত, লাইনটা আমি এই বইতেই পড়েছি। খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেলাম। পেলাম না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিলাম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বইটা পড়ে ফেলব। বইটা শুধুই বাংলা অনুবাদ ছিল, সঙ্গে আরবি লাগানো ছিল না। আমি ফিকশন পড়ার মতো করে পড়তে থাকলাম। তিন-চার পাতা পড়ার পরই আমার মনে হতে থাকল কেউ বুঝি আমার সাথে কথা বলছে। কেউ বুঝি আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। কেউ বুঝি আমার বর্তমান অবস্থা ব্যাখ্যা করছে, যেন আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। যতই পাতা উলটাচ্ছি ততই আটকে যাচ্ছি, আর আমি মরিয়া হয়ে খুঁজছি সেই লাইনটাকে। পড়ছি আর কতশত বিষয়ের সাথে পরিচিত হচ্ছি। এভাবে পড়তে পড়তে পৌঁছে গেলাম ৯৪ নম্বর সুরা, সুরা আল হালিশিরাহতে। সেখানে পাঁচ নম্বর আয়াতে লেখা আছে এই লাইনটি। একই কথা ইনার লাইনেও, তার পরপরই বলা হচ্ছে "যখন অবসর পান পরিশ্রম করুন। এবং আপনার পালনকর্তার প্রতি মনোনিবেশ করুন।”
ব্যাস। আমার মনে হলো, এখন আমার কী করতে হবে সেটা বলে দেওয়া হলো। আমার অখণ্ড অবসর, স্ত্রী আর সন্তানের মৃত্যুর পর অফিসে যাওয়া ছেড়ে সিয়েছিলাম। এরপর আমি সেই উত্তরটা পেয়ে গেলাম যে, আমাকে আসলে কন্ট্রোল করে কে! তাঁকে আরও ভালোমতো বোঝার জন্য আমি পড়াশোনা শুরু করলাম। কয়েক প্রকার তাফসিরসহ কোরআনটা আবার পড়লাম। আমি সাইন্সের স্টুডেন্ট, আল কোরআনের সাইন্স রিলেটেড আয়াতগুলো বিজ্ঞানের সর্বশেষ থিয়োরিগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখতে গিয়েই ভেঙে পড়ল আমার দীর্ঘদিনের বয়ে বেড়ানো ভুল বিশ্বাস। সে বিশ্বাসটা ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমাকে ইমান আনতে হবে। আমি এক মসজিদের ইমামকে গিয়ে বললাম- "আমাকে মুসলমান বানান।” তিনি বললেন- "যান, গোসল করে আসেন।” আমি বাসায় গিয়ে ভালোমতো গোসল করলাম। কতদিন পর গোসল করলাম জানি না। দীর্ঘ সময় নিয়ে নিজেকে সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করলাম। তারপর ইমামের কাছে ফিরে গেলাম।
আসরের নামাজের পর ইমাম কিছু লোকজন নিয়ে মসজিদে বসে ছিলেন, তখন আমি উপস্থিত হলাম। ইমাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন-
'আপনার নাম কী?'
'ইউসুফ মাহমুদ।'
নাম শুনে মসজিদে উপস্থিত সবাই এ-ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি শুরু করল। ইমাম নিজেও থতমত খেলো। তিনি ভুল শুনেছেন মনে করে আবার জিজ্ঞেস করলেন, আমি একই উত্তর দিলাম।
'মশকরা করেন?'
'জি না, এটাই আমার নাম।'
'আপনি তো ভাই মুসলমান, আবার নতুন করে মুসলমান হওয়ার কি
আছে?'
'জি না, আমার নামটা মুসলমানের কিন্তু আমি মুসলমান না।'
'আপনার বাবার নাম কী?'
'হানিফ মাহমুদ।'
'মায়ের নাম কী?'
'আমেনা বেগম।'
আপনি তো মুসলিম পরিবারের সন্তান!'
'কিন্তু আমি মুসলমান না।'
'নাস্তিক?'
'হ্যাঁ, অনেকটা সেরকম।'
'তাহলে তওবা করেন। আল্লাহ মাফ করে দেবেন। নতুন করে মুসলমান হতে হবে না।'
আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এই হুজুর আমার অবস্থা বুঝতে পারছে না। আমি শীতল কণ্ঠে আবার বললাম-
'আমাকে মুসলমান বানান।'
'দেখুন আপনি মুসলমানের সন্তান, হয়তো সঙ্গদোষে বা কারও প্ররোচনায় নাস্তিক হয়ে গিয়েছিলেন, এখন তওবা করেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল।'
আমি ভেতরে ভেতরে রাগে উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। নিজেকে সংযত রেখে শীতল কণ্ঠে বললাম—
'নাম ও সামাজিক পরিচয়ে আমার পরিবার মুসলমান। আমি জীবনে দুই- একবার ঈদের নামাজ ছাড়া আর কোনো নামাজ পড়িনি। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় শিখেছি ধর্ম এক প্রকার মাদক। চাকরিতে ঘুস খেয়ে যে সম্পদ বানিয়েছি তার পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা। সেই টাকা আমি বিদেশে পাচার করেছি। ইসলাম মানে যদি আত্মসমর্পণ হয়, তবে আমি সেই পলাতক অপরাধী, আমি সেই পলাতক আসামি, আজ আল্লাহর ঘরে এসেছি আত্মসমর্পণ করতে। আমাকে মুসলমান বানান।'
রাগে-অভিমানে আমার চোখ লাল হয়ে গিয়েছিল। আমার শরীর থরথর করে কাঁপছে আর আমি কাঁদছি। আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম-
'মৃত্যুর আগেই আমাকে তাড়াতাড়ি মুসলমান বানান।'
আমার এই কথায় মুহূর্তে বদলে গেছে মসজিদের পরিবেশ। হুজুর খপ করে আমার হাত চেপে ধরলেন। আমি কাউকে কাউকে চোখ মুছতে দেখলাম। আমি হুজুরের হাতে হাত রেখে সাক্ষ্য দিলাম-
'আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আর মুহাম্মদ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর দাস ও প্রেরিত রসুল।'
আমি পরেরদিন অফিসে গিয়ে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে এলাম। ইতোমধ্যে সবাই জানে যে স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পর আমি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছি। আমার অবৈধ উপার্জনের সবকিছু থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছি।
ইস্কাটনের দুই হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট আর তার সবকিছু ছেড়ে চলে এলাম কামরাঙ্গীর চরে। ছোট এক রুমের একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি, আর বাবুবাজার ও সোয়ারিঘাটে কামলা, মিনতি, জোগালি, যে দিন যে কাজ পাই সেটাই বাবুবা ফজরের পর থেকে জোহর পর্যন্ত কাজ করলে নিজের চলার জন্য যথেষ্ট হালাল উপার্জন হয়ে যায়। হারাম খেয়ে খেয়ে শরীরে যে রক্ত, মেদ ও মাংস তৈরি হয়েছিল, সেটা হালাল উপার্জনের কায়িক পরিশ্রম আর দিনের পর দিন রোজা রেখে দূর করেছি। আলহামদুলিল্লাহ এই যে এখন আমার শুকনা পাতলা শরীর, কোটা হালাল রোজগারের ফল। কাছেই একটা বড় মাদ্রাসা আছে, তাদের লাইব্রেরিতে আছে প্রচুর বই। জোহরের পর থেকে এশা পর্যন্ত সেই লাইব্রেরিতে আমি টানা পড়াশোনা করতাম। দ্রুত শিখে নিয়েছি অ্যারাবিক। মাদ্রাসার শিক্ষক, ছাত্র সবাই আমাকে সাহায্য করত, অনেক ভালোবাসত। আমি এভাবে ১৫ বছরে দাওরায়ে হাদিস শেষ করেছি। তারপর একদিন মাদ্রাসার বড় হুজুর আমাকে ডেকে বললেন-
মান। আমি জীবনে দল কোনো ইমাম বেশি দিন থাকেন না। বড় হুজুর আমাকে এখানে ইমামতি করার 'আপনার এখন 'দাওয়া'র কাজ করা উচিত'। বেতন নেই বলে এই মসজিদে পোড়া জন্য পাঠিয়ে দিলেন। সেই থেকে আমি এখানে আছি।
ঘ্রই আল্লাহ পরম দয়
ম। নিজেকে সংযত ও
বিদেশে পাচার করেছি হচ্ছে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির ব্যাপারে মানুষের কোনো খবর নেই। আমি দেখলাম চারদিকে অনেক ওয়াজ-মাহফিল আর দাওয়াতের কাজ আর সেটা হলো-মানুষ আখেরি জামানার বিপদ সম্পর্কে বেখেয়াল। নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে গেছেন কেয়ামত অতি নিকটে। তাঁর সেই বলা থেকে ইতোমধ্যে ১৪০০ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। তার মানে এই পৃথিবীর সময় আর বেশি নেই, শেষের শুরু হয়ে গেছে। সব ধর্মেই এর প্রস্তুতি চলছে, শুধু মুসলিমরাই বেখেয়াল। আমি প্রতি শুক্রবার জুম্মার খুতবায় শেষ সময়ের বিষয়ে নবি সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে যেসব সতর্কবাণী ভবিষ্যদ্বাণী রূপে দিয়েছেন, সেসব নিয়ে আলোচনা করি। সেসব আলোচনা কয়েকজন মাদ্রাসার ছাত্র মোবাইল ফোনে রেকর্ড করে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে। তেমন এক ভিডিও দেখে আমার কাছে এসেছিল জামান।'
ইউনিভার্সিটিতে পড়লা
য়ে যে সম্পদ বনিয়ো
কে অপরাধী, আমি সে
পর্ণ করতে। আমায়
আমার শরীর থরথ্য
লাম-
বশ। হুজুর খপ করে
তে দেখলাম। আমি
নাহু আলাইহি ওয়
লাম। ইতোমধে
হারিয়ে ফেলেছি।
নিয়েছি।
একনাগাড়ে কথা বলে থামলেন ইমাম ইউসুফ মাহমুদ। আর তখনই যেন ঘোরের ভেতর থেকে বের হয়ে এলো ইনসপেক্টর আফজাল। অবাক বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে সামনে বসা লোকটির দিকে। ইমামের প্রতি শ্রদ্ধায় ভরে উঠেছে তার বুক। মসজিদের সাথে লাগানো ছোট্ট টিনশেড ঘরটার খোলা লাইটের আলো ভেদ করে এক জ্যোতির্ময় মানুষ নতুন করে ধরা দিলো আফজালের চোখে।কোনো প্রশ্ন করার মতো ভাষা হারিয়ে ফেলেছে আফজাল। নিজের ইমোশন গোপন রেখে হঠাৎ করে জানতে চাইল-
'কী নাম রেখেছিলেন আপনার মেয়েটার?'
ফ্লোরে বিছানো তোশকের ওপর মুখোমুখি বসা দুজন, নিজের জীবনের গল্প শেষে দৃষ্টি নত করে ঠায় বসেছিলেন তিনি। আফজালের প্রশ্নে মাথা তুলে তাকালেন। পূর্ণিমা রাতে ঢেউতোলা নদীর ওপর চাঁদের প্রতিচ্ছবি যেমন চিকচিক করে, ইমামের দৃষ্টিটা আফজালের কাছে ঠিক তেমনই মনে হলো।
'পৃথিবীর মানুষকে আর তার নামটা নাই বা বললাম। তার মা তাকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছে, সে শহিদ। সে ছিল ১৫ দিনের নবজাতক, সে জান্নাতি। সে তার বাবা-মাকে ছাড়া জান্নাতে যাবে না। আমার চেয়ে সৌভাগ্যবান আর কে আছে! দুজন জান্নাতি মানুষ আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। আমার সেইসব শোক আজ আনন্দে পরিণত হয়েছে। এখন আমি কোনো শোকে কাঁদি না, কাঁদি সুখে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাকে পথ দেখিয়েছেন, আর আমার প্রিয়জনদের জান্নাতে ঠাঁই দিয়ে আমার জন্য জান্নাতের ব্যবস্থা করে রেখেছেন।'
ইমাম কাঁদছেন, কিন্তু তার মুখে লেগে আছে এক অপার্থিব হাসি। আফজাল অনুভব করছে, তাকে ছেড়ে চলে যাওয়া স্ত্রী পায়েলের জন্য তার আর কোনো কষ্ট লাগছে না।
© Latiful Islam Shibli