18/06/2025
গবাদি পশুর ল্যাম্পি স্কিন ডিজিজ(LSD) : হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা:
ইদানীং গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজের প্রকোপ বেড়েছে। এলোপ্যাথিক ভাবে গরুকে লাম্পি স্কিন ডিজিজের (এল,এস,ডি) চিকিৎসা করলে গরু অনেকটাই দূর্বল হয়ে যায়, হয়তো আরোগ্য তাড়াতাড়ি হয়। কিন্তু হোমিওপ্যাথি মতে চিকিৎসা করালে আরোগ্য দেরিতে হলেও গরু কাবু কম হয়। আজকে হোমিওপ্যাথিক ভাবে এল,এস,ডি'র চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা করবো। এতে চিকিৎসা খরচও অনেক কম হয়।
রোগের কারণ:
মূলত এক প্রকার পক্স ভাইরাস বা এলএসডি ভাইরাসের সংক্রমণে গবাদিপশুতে এই রোগ দেখা দেয় এবং এক গরু থেকে আরেক গরুতে ছড়িয়ে পড়ে। রোগের সময় প্রধানত বর্ষার শেষে, শরতের শুরুতে অথবা বসন্তের শুরুতে যে সময়ে মশা মাছি অধিক বংশবিস্তার সেই সময়ে প্রাণঘাতী এই রোগটি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
রোগের লক্ষণ:
১. আক্রান্ত গরু প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হয় এবং খাবারে রুচি কমে যায়।
২. জ্বরের সাথে সাথে মুখ দিয়ে এবং নাক দিয়ে লালা বের হয়, পা ফুলে যায়, সামনের দু’পায়ের মাঝ স্থানে পানি জমে যায়।
৩. শরীরের বিভিন্ন জায়গা চামড়া পিণ্ড আকৃতি ধারণ করে, লোম উঠে যায় এবং ক্ষত সৃষ্ট হয়। ধারাবাহিকভাবে এই ক্ষত শরীরের অন্যান্য জায়গা ছড়িয়ে পড়ে।
৪. ক্ষত মুখের মধ্যে, পায়ে এবং অন্যান্য জায়গা ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৫. ক্ষত স্থান থেকে রক্তপাত হতে পারে। শরীরে কোথায় ফুলে যায় যা ফেটে টুকরা মাংসের মতো বের হয়ে ক্ষত হয়, পুঁজ কষানি বের হয়।
৬. পাকস্থলী অথবা মুখের ভেতরে সৃষ্ট ক্ষতের কারণে গরু পানি পানে অনীহা প্রকাশ করে এবং খাদ্য গ্রহণ কমে যায়।
যেভাবে ছড়ায়:
১. মশা ও মাছি : এই রোগের ভাইরাসের প্রধান বাহক হিসাবে মশা মাছিকে দায়ী করা হয়। অন্যান্য কীট পতঙ্গের মাধ্যমেও ভাইরাসটি আক্রান্ত গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২. লালা : আক্রান্ত গরুর লালা খাবারের মাধ্যমে অথবা খামারে কাজ করা মানুষের কাপড়ের মাধ্যমে এক গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়াতে পারে।
৩. দুধ : যেহেতু আক্রান্ত গাভীর দুধে এই ভাইরাস বিদ্যমান থাকে তাই আক্রান্ত গভীর দুধ খেয়ে বাছুর দুধ খেয়ে আক্রান্ত হতে পারে।
৪. সিরিঞ্জ : আক্রান্ত গরুতে ব্যবহার করা সিরিঞ্জ থেকে এই ভাইরাস বাহিত হতে পারে।
৫. রক্ষণাবেক্ষণকারী : খামারে কাজ করা মানুষের পোশাকের মাধ্যমে আক্রান্ত গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
রোগের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা:
অন্যান্য ভাইরাসঘটিত রোগের মতো এই রোগেরও অ্যালোপ্যাথিতে কোন আরোগ্যকারী চিকিৎসা নেই। তবে হোমিওপ্যাথিতে এর যথেষ্ট ভাল চিকিৎসা রয়েছে।
১. ভেরিওলিনাম – ৩০/২০০
২. ম্যালেড্রিনাম – ৩০/২০০
৩. সারসিনিয়া – ৩০/ ২০০
১ম ঔষধঃ শুধু সকালে ১০ ফোঁটা করে ঔষধ, পরপর ২দিন
২য় ঔষধঃ দুপুর ও সন্ধায় ৫-৭ ফোঁটা করে ঔষধ প্রতিবার, পরপর ৭-১০ দিন
৩য় ঔষধঃ বিকালে রাতে ৫-৭ ফোঁটা করে ঔষধ প্রতিবার।
এছাড়া চামড়ার গুটিগুলো যদি কোনো কারণবশত বা চিকিৎসা দেরিতে শুরু হবার কারণে ফেটে গিয়ে রক্ত বের হয়- তবে ক্যালেন্ডুলা মাদার টিংচার ক্ষতস্থানে লাগাতে হবে। এবং
৪. মার্ক সল – ২০০ খাওয়াতে হবে; সকালে ১০ ফোঁটা করে যতদিন ঘা না শুকাবে।
বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, ঔষধ খাওয়ানোর পরিমাণ অবশ্যই গরুর বডি স্ট্রাকচার অনুযায়ী কমবেশি হতে পারে ও ঔষধ জিহবায় ঢেলে দিবেন। যদি তা না পারেন অল্প পরিমাণ সাদা পানির সাথে মিশিয়ে খাওয়াবেন। কোন খাবারের সাথে ঔষধ মিশাবেন না। আর খাবার দেবার ৩০ মিনিট আগে ঔষধ খাওয়াবেন।
এছাড়া কুপ্রাম সালফ ২০০ ও ভেরিওলিনিম ২০০ প্রত্যেকটি ঔষধের ২ ফোঁটা অল্প পানিতে মিশ্রিত করে দিনে ২ বার খাওয়াতে হবে ৭ দিন।
প্রতিষেধকঃ প্রতিষেধকের জন্যে উপরের প্রত্যেকটি ঔষধের ২ ফোঁটা অল্প পানিতে মিশ্রিত করে দিনে ১ বার খাওয়াতে হবে ৭ দিন।
(সকল গবাদি পশুকে প্রতি মাস পরপর ৩ মাস খাওয়াতে হবে)
প্রতিকারে কৃষক সচেতনতা ও করণীয়:
যেকোন রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিকার সব সময় অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। কাজেই এর প্রতিকারে যে কাজগুলো করা যেতে পারে-
১. আক্রান্ত গরুকে নিয়মিত এলএসডি ভ্যাকসিন দেয়া।
২. খামারের ভেতরের এবং আশেপাশের পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা- যেন মশা মাছির উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
৩. আক্রান্ত খামারে যাতায়াত বন্ধ করা এবং আক্রান্ত খামার থেকে আনা কোনো সামগ্রী ব্যবহার না করা।
৪. আক্রান্ত গরুকে শেড থেকে আলাদা স্থানে মশারি দিয়ে ঢেকে রাখা মশা মাছি কামড়াতে না পারে। কারণ আক্রান্ত গরুকে কামড়ানো মশা মাছি সুস্থ গরুকে কামড়ালে এই রোগের সংক্রমণ হতে পারে।
৫. আক্রান্ত গভীর দুধ বাছুরকে খেতে না দিয়ে ফেলে দিয়ে মাটি চাপা দেয়া।
৬. আক্রান্ত গরুর পরিচর্যা শেষে একই পোশাকে সুস্থ গরুর মধ্যে প্রবেশ না করা।
৭. আক্রান্ত গরুর খাবার বা ব্যবহার্য কোনো জিনিস সুস্থ গরুর কাছে না আনা।
৮. ক্ষতস্থান টিনচার আয়োডিন মিশ্রণ দিয়ে পরিষ্কার রাখা।
লেখক : ভাস্কর সরকার
রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, ঘোড়ামারা, রাজশাহী৷