12/10/2019
কবুতর পরিচিত গৃহপালিত পাখি। দেখতে বেশ চমৎকার। বিভিন্ন রঙের ও ঢঙের, সাদা, কালো, সিলভার, হলুদ, খয়েরি ও নীল বর্ণের। কবুতর মানুষের রাগ-অনুরাগ বোঝে। শত্রু-মিত্র চেনে। একবার যাকে দেখে তাকে আর ভোলে না। কবুতরের ডিগবাজি, ভেল্কিবাজি ও ওড়াউড়ি মানুষকে বিমোহিত করে। পায়রার রমণপ্রয়াসী বকম বকম অব্যক্ত ও মধুর ধ্বনি যে কাউকে আকৃষ্ট করে।
কবুতর শান্তির প্রতীক। এ জন্য যে কোনো শুভ অনুষ্ঠানে শান্তির শ্বেতকপোত উড়ানো হয়। কবুতর উড়ানোর প্রথা সেকাল থেকে অদ্যাবধি প্রচলিত আছে। আগেকার দিনে শাসক ও অভিজাত শ্রেণী পায়রার মাধ্যমে সংবাদপত্র আদান-প্রদান করত। মোগল আমলে লক্ষ্নৌর নবাবরা পায়রা নিয়ে দিনমান কাটিয়ে দিতেন। অনেক নবাব-রাজা-বাদশাহর এ ধরনের শখ ছিল। উনিশ শতকে কলকাতার বাবুরা ডুবে গিয়েছিল বিলাসব্যসনে। তারা কবুতরের বিয়েতে লাখ লাখ টাকা খরচ করত।
এ কবুতরকে আমরা বিভিন্ন নামে চিনি। যেমন- পায়রা, কপোত, পারাবত, কলরব ও প্রাসাদকুক্কুট। ভাষাবিদরা বলেন, কবুতর শব্দটি এসেছে অস্ট্রিক ভাষা থেকে। আপন্নসংস্কার হয়ে সংস্কৃতে ঢুকেছে। কবুতরকে কপোত বলার ব্যাখ্যা অভিধানে এভাবে এসেছে, ক মানে বায়ু। এ বায়ুতে এটি পোত বা জাহাজের মতো চলে বলে এর নাম কপোত। পাখিটি বাড়িতে কুক্কুট বা মোরগের মতো ঘুরে বেড়ায় বলে এটি প্রাসাদকুক্কুট। নদীর তীরে পত করে পড়ে যাওয়ার কারণে এর নাম পারাবত। এ শব্দ থেকেই বাংলা চলিত ভাষায় পায়রার জন্ম।
গৃহপালিত পাখির মধ্যে কবুতর খুব প্রাচীন। পৃথিবীতে ৬০০ প্রজাতির কবুতর আছে। মাংস উৎপাদনের জন্য সিলভারকিং, হামকাচ্চা, কারনিউ, মনডেইন-সুইস, ফ্রেন্স, আমেরিকান জায়ান্ট, হোমার, রান্ট, ডাউকা, কাউরা, গোলা, গোলি, পক্কা, লক্ষা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ফ্লাইং হিসেবে বার্মিংহাম রোলার, টিপলার, থাম্বলার, কিউমুলেট, হর্সম্যান প্রসিদ্ধ। শোভাবর্ধনকারী হিসেবে মালটেজ, ক্যারিয়ার, হোয়াইট ফাউন্টেল, টিম্বালার, পোটারস, নান্স অন্যতম। চিত্তবিনোদনের জন্য ময়ূরপঙ্খী, সিরাজি, লাহোরি, ফ্যানটেইল, জেকোডিন, মুক, গিরিবাজ, টেম্পলারলোটন- এসব জাতের কবুতর রয়েছে। গিরিবাজ কবুতর উড়ন্ত অবস্থায় ডিগবাজি খেয়ে চিত্তাকর্ষণ করে। কবুতরের আয়ুষ্কাল ১০ থেকে ১৫ বছর। পাখি বিশারদদের মতে, এসব প্রজাতির বেশি পাওয়া যায় ভারত, মালয়, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে। এছাড়াও আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্য কবুতরের একটি জাত হচ্ছে- 'জালালি কবুতর'। এ নামটি হজরত শাহজালাল (রহ.) এর পুণ্য স্মৃতির সঙ্গে জড়িত।
কবুতর খুব বিচক্ষণ পাখি। মানবিক উপকারিতা ছাড়াও কবুতর ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেয়। সম্প্রতি নেপালের ভূমিকম্পে তার প্রমাণ ঘটে। নেপালের পশুপতিনাথ মন্দিরের স্থায়ী বাসিন্দা হাজার কয়েক পায়রাকে ডেকে ব্যর্থ হন। তিনি যখন খাবারের জন্য তার পোষা কবুতরগুলোকে ডাকছিলেন, সেদিন চেনা সে ডাকে সাড়া না দিয়ে আকাশে উন্মাতাল উড়ছিল। যার কিছুক্ষণ পরই ঘটে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প। এ ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ১৯৬৬ সালে চীনের শিংতাই প্রদেশে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের আগে দিনভর আকাশে উড়েছিল পায়রারা। ২০০১ সালে গুজরাটের ভুজ কেঁপে ওঠার আগেও স্থানীয় বাসিন্দারা অবাক হয়ে গিয়েছিলেন পায়রাদের এমন অস্থির ডানা ঝাপটানো দেখে।
কবুতর পুষে একদিকে আমিষ জাতীয় খাদ্যের চাহিদা মেটানো যায়, অপরদিকে বাড়তি আয়েরও সুযোগ হয়। কবুতর পালনে বাড়তি জ্ঞান ও শিক্ষার প্রয়োজন পড়ে না, শুধু সামান্য নজরদারি আর সতর্ক হলেই চলে। এতে স্বল্প পুঁজি ও শ্রমে সহজেই লাভবান হওয়া যায়। কবুতরের থাকার ঘর তৈরি করতেও খরচ কম লাগে। খাবারও সুলভ ও সহজলভ্য। বাচ্চা কবুতরের রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। ২৫ থেকে ২৬ দিন বয়স হলেই খাবার উপযোগী হয়। এ সময় বাচ্চা সরিয়ে ফেললে মা কবুতর নতুন করে ডিম দিতে প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
বাচ্চা কবুতর জোড়া যদি নর ও মাদি হয় এবং ভালো খাবার পায় তবে পাঁচ মাসের মধ্যে এরা প্রথম ডিম দেয়। গড়ে প্রতি মাসে একবার ডিম দেয়। অনুকূল পরিবেশ, ভালো খোঁপ ও খাবার পেলে অধিকাংশ জাতের কবুতর প্রতি ৫০ দিনের মধ্যে দুইবার ডিম দেয়। স্ত্রী-পুরুষ উভয়েই পালাক্রমে ডিমে তা দেয়। কবুতর সাধারণত জোড়া বেঁধে থাকতে পছন্দ করে।
কবুতর নর ও মাদি দুই শ্রেণীরই হয়। এসব কবুতর চেনার কিছু উপায় রয়েছে। নর কবুতর সাধারণত আকারে বড় হয়। পা ও আঙুল অসমান ও অমসৃণ হয়। গলার রগও তুলনামূলক মোটা হয়। নর কবুতরের ঠোঁটে ধরলে সে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। খুব ঘনঘন ও জোরে জোরে ডাকে। সূর্য ডোবার আগে অস্থির হয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে মাদি কবুতর এসবের বিপরীত হয়।
কবুতরের খাবারে রয়েছে বৈচিত্র্য। কবুতর সাধারণত যব, ভুট্টা, গম, ধান, চাল, কলাই, কাউন, খুদ, খেসারি, সরিষা, রেজা, বাজরাসহ বিভিন্ন ধরনের বীজ খেয়ে থাকে। মুরগির জন্য তৈরি খাবারও কবুতর খায়। খাবারের সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি দিতে হয়। মানুষ তা নেশা, পেশা ও শখের বশেই করে- শৌখিনরাও কবুতর পোষেন। কবুতর নিজের মতো বিভিন্ন ক্ষেত-খামারে, বাড়ির ছাদে, পুরনো ভবনের ভেতর স্বাধীনভাবে বসবাস করে। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মঠেও কবুতর উড়তে দেখা যায়। গ্রামের ১০০ ঘরের মধ্যে ৬০ ঘরেই কবুতর পালতে দেখা যায়।
কবুতরের যম বাজপাখি। এ জন্য কবুতরের বাসস্থান নিরাপদ জায়গায় রাখা উচিত। কুকুর, বিড়াল, বেজির আক্রমণ থেকেও দূরে রাখতে হবে। উঁচু ও শক্ত ঘর বাঁধতে হবে। কাঠ, বাঁশ ও বাঁশের চাটাই, শন, পলিথিন, খড় ইত্যাদি উপকরণ দিয়ে কবুতরের ঘর বানানো যায় সহজেই। প্রতি মাসে একবার করে ঘর পরিষ্কার করে দিতে হবে।
হাদিসে পাকে কবুতরের কথা উল্লেখ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর হিজরতের সময় ছুর পাহাড়ের গুহামুখে কবুতরের ডিম দেয়া তার একটি মোজেজাও বটে। এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামদের ঐকমত্য রয়েছে। মহানবী (সা.) পোষা পশুপাখির যত্ন-আত্তি করার ব্যাপারে উৎসাহ দেন। তিনি এরশাদ করেন, 'যদি কোনো মুসলিম পোষা প্রাণী রাখতে পছন্দ করেন, তার দায়িত্ব হলো ভালো মতো এর যত্ন নেয়া। যথাযথ খাদ্য, পানি ও আশ্রয়ের ব্যাপারে খেয়াল রাখা। যদি কেউ পোষা প্রাণীর যত্নের ব্যাপারে উদাসীন হয় তার কঠিন শাস্তি বর্ণনা করেছেন।' (বোখারি)।
কবুতরের গোশত খুব জনপ্রিয়। অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। এক সময় কবুতরের গোশত ছাড়া জামাই আপ্যায়ন হতো না। কবুতর খাওয়া সম্পূর্ণরূপে হালাল। আর হালাল খাবারের ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের বাণী, 'তোমরা উত্তম ও পবিত্র বস্তু খাও, যা আমি তোমাদের জীবিকারূপে দান করেছি।' (সূরা বাকারা : ১৭২)।