11/06/2026
"স্তন কর" বা "মুলাক্করম" (Mulakkaram)আইন!!
সভ্যতা নিয়ে জন্ম নিয়ে রাস্ট্র কিভাবেই নারীকে অসভ্যের জন্য কর আরোপ করেছিল,গা শিহরিত হয়ে উঠবে!!!
নিজের শরীর ঢাকতে চাইলে কর দিতে হবে, আর করের পরিমাণ ঠিক হবে স্তনের আকার মেপে!" — আজ থেকে প্রায় সোয়া দুশো বছর আগে ভারতের কেরালা (তৎকালীন ত্রিভাঙ্কুর) রাজ্যে প্রচলিত এই আদিম ও চরম অবমাননাকর আইনটির নাম ছিল ‘মূলাক্করম’ বা স্তন কর। এই প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের বুকেই একদিন কুঠারাঘাত করেছিলেন এক অপরাজেয় নারী, যার নাম নাঙেলি। ইতিহাসে তাঁর এই লড়াই কেবল কর ফাঁকি দেওয়ার সংগ্রাম ছিল না, এটি ছিল নারীর আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার এক রক্তাক্ত দলিল।
অন্ধকার আইন ও শোষণের রূপরেখা উনিশ শতকের শুরুতে ত্রিভাঙ্কুর রাজ্যে জাতিভেদ প্রথা এমন এক কুৎসিত রূপ নিয়েছিল, যেখানে উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কোনো নিম্নবর্ণের (বিশেষ করে ইঝাভা ও নাদার) নারীর বুক ঢাকা রাখার অধিকার ছিল না। আইন অনুযায়ী, নারীদের জনসমক্ষে স্তন উন্মুক্ত রাখতে হতো। যদি কোনো নারী নিজের সম্ভ্রম রক্ষার্থে শরীর আবৃত করতে চাইতেন, তবে তাঁকে গুনতে হতো চড়া শুল্ক।
সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় ছিল, এই শুল্কের কোনো নির্দিষ্ট হার ছিল না। কর সংগ্রাহকরা নারীদের স্তনের আকার মেপে করের পরিমাণ নির্ধারণ করত। এই শোষণের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটা বড় অংশ চলে যেত পদ্মনাভস্বামী মন্দিরের তহবিলে, যা আজ বিশ্বের অন্যতম ধনী মন্দির হিসেবে খ্যাত। এই প্রথা কেবল অর্থনৈতিক শোষণ ছিল না, এটি ছিল নিম্নবর্ণের নারীদের মানসিকভাবে পঙ্গু ও দাস বানিয়ে রাখার এক সুপরিকল্পিত সামাজিক ষড়যন্ত্র।
নাঙেলির বজ্রনিনাদ ও রক্তাক্ত প্রতিবাদ কেরালার চেরথালা অঞ্চলের ৩৫ বছর বয়সী সাহসী নারী নাঙেলি এই দাসত্ব মেনে নেননি। কৃষ্ণবর্ণের এই শ্রমজীবী নারীকে কাজের প্রয়োজনে প্রায়ই বাইরে যেতে হতো। তিনি সমাজের এই নোংরা নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সবসময় শরীর আবৃত রাখতেন। স্বাভাবিকভাবেই একদিন তিনি শুল্ক সংগ্রাহকদের নজরে পড়েন এবং তাঁর কাছে বকেয়া কর দাবি করা হয়।
নাঙেলি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, "আমার শরীর আমি ঢাকব কি না, তা রাষ্ট্র ঠিক করার কে?" কর দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় দিন দিন তাঁর ওপর মানসিক চাপ ও বকেয়া করের বোঝা বাড়তে থাকে।
অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক দিন। কর সংগ্রাহকরা তাঁর বাড়ির দোরগোড়ায় এসে হাজির হলো। নাঙেলি শান্ত মুখে তাদের বাইরে অপেক্ষা করতে বলে ঘরের ভেতরে গেলেন। কিন্তু তিনি টাকা নিয়ে ফিরলেন না; ফিরলেন এক চরম ও নৃশংস প্রতিবাদের রূপ নিয়ে। ঘরের ভেতরে ধারালো কাটারি দিয়ে নিজের স্তন দুটি কেটে ফেললেন তিনি। রক্তাক্ত সেই স্তনদ্বয় কলাপাতায় মুড়িয়ে কর সংগ্রাহকদের সামনে এনে ছুড়ে দিয়ে বললেন, "যে অঙ্গের জন্য তোমরা কর নিতে এসেছ, সেই অঙ্গই আমি রাখব না। নাও, তোমাদের কর!"
এক আত্মত্যাগ, যা কাঁপিয়ে দিল রাজপ্রাসাদ এই অভাবনীয় ও বীভৎস প্রতিবাদ দেখে শুল্ক সংগ্রাহকসহ পুরো গ্রাম স্তব্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নাঙেলির মৃত্যু হয়। কিন্তু নাঙেলির শরীরের আগুন নেভেনি। তাঁর চিতা যখন দাউদাউ করে জ্বলছিল, তখন সমাজকে আরও একবার স্তব্ধ করে দিয়ে নাঙেলির স্বামী চিরুকুন্দন সেই জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। ভারতীয় ইতিহাসে কোনো পুরুষের স্ত্রীর জন্য সতী বা সহমরণে যাওয়ার এটাই প্রথম ও শেষ নজির।
নাঙেলির এই আত্মবিসর্জন কেরালা তথা পুরো ভারতের বুকে এক দাবানল জ্বালিয়ে দেয়। এই ঘটনার তীব্রতায় কেঁপে ওঠে ত্রিভাঙ্কুরের রাজসিংহাসন। বাধ্য হয়ে রাজা স্তন করসহ সমস্ত অবৈধ শুল্ক বাতিল ঘোষণা করেন। এই ঘটনাই ১৮৫৯ সালে সংগঠিত ঐতিহাসিক ‘কাপড় দাঙ্গা’ বা পোশাক বিপ্লবের (Channar Revolt) বীজ বুনে দিয়েছিল,যার মাধ্যমে নিম্নবর্ণের নারীরা তাঁদের শরীর ঢাকার আইনিঅধিকার ছিনিয়ে নেন।
ইতিহাসের উপেক্ষিত বীরাঙ্গনা নাঙেলি কোনো রাজপরিবারের রানী ছিলেন না, ছিলেন এক সাধারণ দলিত নারী। হয়তো সে কারণেই মূলধারার ইতিহাসে দীর্ঘদিন তাঁর নাম উপেক্ষিত থেকেছে। কিন্তু যে চেরথালা গ্রামে তিনি বাস করতেন, তাঁর স্মরণে সেই জায়গার নাম রাখা হয়েছিল ‘মূলাচিপারাম্বু’— যার অর্থ "স্তনধারী নারীর ভূমি"।
সবাই অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে আপস করে না। নাঙেলিও পারতেন কর দিয়ে বাঁচতে, কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন অধিকারের লড়াই। নিজের জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গেছেন, সম্মান ও আত্মমর্যাদার চেয়ে বড় কোনো সম্পদ মানুষের হতে পারে না। আজ নারীবাদ ও মানবাধিকারের ইতিহাসে বীরাঙ্গনা নাঙেলি এক চির অম্লান অগ্নিশিখা।
---সংগৃহীত