23/06/2025
#মেঘ তুমি বৃষ্টি হয়ে নামো
#শারমিন আঁচল নিপা
#পর্ব- ২০
অফিসার মাহির নিজেকে বেশ ক্ষত বিক্ষত করে নিয়ে এসেছে। মনে হচ্ছে তাকে কেউ মেরেছে। তবে প্রথম দিকে এমন ভাবে আসার মানে সামির সাহেব বুঝতে না পারলেও পরবর্তীতে বুঝতে পারে কেন তিনি এমন করেছেন।
কাঠগড়ায় বৃষ্টি দাঁড়িয়ে আছে। অপর পাশেই অফিসার মাহির। মেঘের পরিবারের পক্ষ থেকে এসেছে এডভোকেট তরুন রায়। আর বৃষ্টির পক্ষ থেকে আনা হয়েছে এডভোকেট মুমুকে। তরুন রায় বেশ দক্ষ একজন এডভোকেট। এ পর্যন্ত তিনি কোনো কেইসে হারেননি। কোর্টে তরুন রায়ের বিপক্ষে লড়তে কেউ চায় না। কারণ সবাই জানে যে কেইসে তরুন রায় আছে সে কেইসে আর কেউ জিততে পারবে না৷ তবে মুমু এদিক থেকে আলাদা। সে নতুন হলেও নিজেকে বেশ দক্ষভাবে গড়ে তুলেছে। সে এটাতে বিশ্বাসী সত্যের জয় সর্বত্রই।
প্রথমেই তরুন রায় অফিসার মাহিরকে কাঠগড়ায় জিজ্ঞেস করল
"অফিসার মাহির দুটো ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী আপনি। আপনিই বলুন মেঘের মৃত্যুর দিন কী ঘটেছিল আর যেদিন বৃষ্টি মেঘের পরিবারের প্রাণ নেয় সেদিন কী ঘটেছিল?"
অফিসার মাহির বেশ অসহায় গলায় বলল
"আমার আজকের এ অবস্থার জন্যও বৃষ্টি দায়ী। যেদিন মেঘ মারা যায় সেদিন সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট বুঝা যায় মেঘকে বৃষ্টি দেয়াল টপকে মেরে ৩০ মিনিট পর সে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। মেঘকে মারার একটায় কারণ ছিল মেঘ ওর সাথে বিয়ে ভেঙে দিয়ে বৈশাখীকে বিয়ে করতে চেয়েছিল।
এরপর যখন আমি সবকিছু বুঝে তাকে আটক করি। তখন বৃষ্টি জেল থেকে পালায়। জেল থেকে পালিয়ে সে সামির সাহেবের বাসায় আশ্রয় নেয়। সামির সাহেবও চেয়েছিল বৃষ্টিকে নির্দোষ প্রমাণ করতে। কারণ বৃষ্টির চরিত্র তো ভালো না। একই বাসায় একই রুমে থেকেছে। তাদের মাঝে কত কী হয়েছে সেটা আর কোর্টে খোলাখোলি বলে পরিবেশ নষ্ট না করি।
আর এদিকে আমাদের সামির সাহেব বৃষ্টির এ ফাঁদে পা দিয়ে তাকে নির্দোষ প্রমাণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। সে মেঘের ড্রয়ারে নেশার ঔষধ রেখে দেয়। সেখানে কৌশলে জমশেদ সাহেবের হাতের ছাপ মিশিয়ে দেয়। যাতে করে সে বুঝাতে পারে এ খুন মেঘের পরিবার করেছে৷
উন্মাদ চরিত্রহীন মেয়ের জন্য সামির সাহেবের মতো সরকারের এমন একজন কর্মচারী বিক্রি হয়ে যাবে ভাবলেই অশান্তি লাগে৷ তবে এখানে একটা কথা আমি খোলাসা করতে চাই। আমার প্রতিপক্ষ হয়তো বলতে পারেন মেঘ আকরাম সাহেবের সন্তান না। হ্যাঁ এটা ঠিক। তবে আকরাম সাহেব আর রেহনুমা রশীদ মেঘকে অনেক ভালোবেসে বড়ো করেছেন। সেটা আশেপাশে মেঘের চারপাশে ঘিরে থাকা মানুষগুলোকে জিজ্ঞেস করলেই প্রমাণ মিলবে৷
যাইহোক প্রসঙ্গে আসি। এ বৃষ্টি মেয়েটা উন্মাদ। জেদের বশে সে সব করতে পারে। জেদের বশে সে মেঘকে খু/ন করেছে সে সাথে মেঘের পরিবারকেও খু/ন করেছে৷ সে বুঝতে পেরেছিল মেঘের পরিবার বেঁচে থাকলে তাকে জেলে পঁচে মরতে হবে। আর সে তো জেলে পঁচে মরবে না। তার কলিজা অনেক বড়ো। জেদের বশে একটা খুন করতে পেরেছে বাকিটাও করতে পারবে।
আর সে জেদ ধরেই সে আকরাম সাহেব, রেহনুমা রশীদ আর জমশেদ সাহেবকে খু/ন করেছে। ঘটনা স্থলের সাক্ষী সে বাসার কাজের মেয়ে সুরাইয়া। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দেখতে পারেন৷ সে সাথে সেখানের দারোয়ান যিনি আমাকে থানা থেকে নিয়ে গিয়েছেন। তাকেও জিজ্ঞেস করতে পারেন৷ এবং আমি গিয়ে সেখানে যে ছুরি উদ্ধার করি সেখানে বৃষ্টির হাতের ছাপ স্পষ্ট।
মহামান্য আদালত বিষয়গুলো এখানেই থেমে গেলে পারত। তবে এখানে থেমে আর যায়নি। বৃষ্টি বুঝে গিয়েছিল আমি তাকে জেলে নিব। তাই রাগের বশে সে আমার উপর হামলা করে। আর আমাদের গুয়েন্দা বিভাগের সামির সাহেব তো বৃষ্টির প্রেমে অন্ধ হয়ে তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করে। আমাকে ক্ষত বিক্ষত করে আমাকে দিয়ে জাবানবন্দি নেয়। আর সেটা রেকর্ডও করে। আমি জানি কিছুক্ষণ পরে সেটা কোর্টে প্রকাশও করা হবে৷ তবে আমি জোর দিয়ে বলছি এটা আমাকে দিয়ে জোর করে বলানো হয়েছে। নিজের প্রাণের ভয়ে বলতে বাধ্য হয়েছি।
আমার সারা শরীরের আঘাতের চিন্হ দেখলেই সেটা প্রমাণ হয়ে যাবে। আমার সাথে যে কয়জন কনস্টেবল ছিল তাদের জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন৷
অফিসার মাহিরের চতুরতা দেখে সামির সাহেব থমকে গেল। রেকর্ডিং আর কোনো কাজে আসবে না। সে এর মধ্যে বুঝিয়ে দিয়েছে রেকর্ডিং টা সামির জোর করে করিয়েছে। তবে সে নিজেকে কতটা নীচে নামিয়েছে তাই ভাবছে সামির সাহেব। বৃষ্টি আর তাকে নিয়ে বলা কথাগুলো তাকে ভীষণ প্যানিকে ফেলে দিল। এদিকে তরুন রায় জজ কে বলে উঠল
"মহামান্য আদালত আপনি অফিসার মাহিরের মুখে সব শুনলেন এবং দেখলেন। এখানে নতুন করে আর কিছু প্রমাণ করার থাকে না। কাঠ গড়ায় দাঁড়ানো অফিসার মাহির নিজেও ভুক্তভুগী। শুধুমাত্র দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাকেও এরকম ঝামেলায় পড়তে হলো। যোগ্য পুলিশ অফিসার এরকম হওয়ায় তো দরকার। তবে তার সাথে যা হয়েছে সেটাও অন্যায়, জুলুম।
অপরদিকে বিপরীত পাশে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো বৃষ্টি মেয়েটি চরিত্রহীন, জেদী, বেপারোয়া। মেঘ তার প্রেমে অন্ধ ছিল। তবে অন্ধত্ব কেটে গেল একটা সময়৷ তবে সে সময়টা ছিল ভুল সময়। বিয়ের দিন অন্ধত্ব কেটে গেলে সে সফলভাবে বিয়ে ভেঙে দেয়। সে বুঝতে পারে এ বৃষ্টি মেয়েটি তার জন্য পারফেক্ট না। আর বৃষ্টি মেঘকে ফাঁসিয়েছিল তার টাকা পয়সা আর যোগ্যতা দেখে। একটা সময় পর সেটা মেঘ বুঝতে পেরে নিজেকে সরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বৃষ্টি সেটা মানতে পারে না। তাই সে মেঘকে খুন করেছে ঠান্ডা মাথায়। এরপর জেদের বশে খুন করেছে মেঘের পুরো পরিবারকে। সে তো উন্মাদ হিংস্র এবং চরিত্রহীন।
পেছন থেকে এডভোকেট মুমু বলে উঠলেন
" এডভোকেট তরুন রায়। আপনার কোনো রাইট নেই আমার মক্কেলকে মিথ্যা দোষ দেওয়ার। এটা সত্য যে সে মেঘের পরিবারকে খুন করেছে। তবে মেঘকে খুন করেনি। একটা মেয়ে কোন পর্যায়ে গেলে এ কাজটা করে আদালতকে সেটা ভাবতে হবে, বুঝতে হবে। আর আপনার কোনো অধিকার নেই বৃষ্টিকে চরিত্রহীন বলার। কোর্টের মতো একটা সুশীল জায়গাকে এসব বলে অশ্লীল করে তুলা আপনার উচিত হয়নি। আপনি বৃষ্টি আর সামির সাহেবকে নিয়ে মনগড়া একটা তথ্য বানিয়ে উপস্থাপন করছেন৷ সামির সাহেবের মানহানী করছেন। এটা যুক্তিযুক্ত না। বৃষ্টির চরিত্র খারাপ সেটার প্রমাণ আছে? আছে কোনো মেডিকেল সার্টিফিকেট? যেখানে বলা হয়েছে সামির সাহেব এবং বৃষ্টির মাঝে শারিরীক সম্পর্ক হয়েছে? তাহলে প্রমাণ ছাড়া এতগুলো অপবাদ আপনি কী করে দিচ্ছেন?
আর এই যে অফিসার মাহির সাহেব আপনাকে আমরা কী করে বিশ্বাস করব? আপনার ডিপার্টমেন্টে এর আগে অনেকেই মোটা অঙ্কের ঘুষ খেয়ে স্ট্যাটমেন্ট চেন্জ করেছে। আপনি যে সে কাঁতারে না সেটা কী করে বিশ্বাস করি বলুন তো? সরকারি চাকুরি। বেতন আহামরি না৷ টাকার অভাবে ছেলে পর্যন্ত মারা যায়। সেই আপনি হঠাৎ কী এমন যক্ষের ধন পেলেন যে এত টাকার মালিক হলেন? শুনেছি আপনার বউয়ের নাকি রেডিসানের নাস্তা ছাড়া চলে না। বড়ো বড়ো ফাইভ স্টারে আপনার এবং আপনার বউয়ের যাতায়াত। আপনার বাড়ির ছোট্ট দালান কোঠা হঠাৎ করে বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স কী করে হলো বলুন তো? আপনার মতো একজন অফিসারের কী করে ঢাকার বুকে ৭ টা বাড়ি হয়ে গেল অল্প সময়ে?
অফিসার মাহির আমতা আমতা করে জবাব দিল
"এগুলো সব আমার স্ত্রীর টাকা, তার বাবা মায়ের টাকা। তাই সে টাকা দিয়েই এগুলো করেছে। সব কিছু স্ত্রী আর তার বাবা মায়ের নামে। আমার তো কিছু নেই। আমি যা ইনকাম করি তা দিয়েই চলি।"।
এডভোকেট মুমু হেসে বললেন
" কোনো অফিসারেই নিজের নামে কিছু কেনে না। কেন কেনে সেটা নিশ্চয় আর নতুন করে বলতে হবে না। আপনি যে এখানে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলছেন সেটা প্রমাণ আমি করে দিব।"
এডভোকেট তরুন রায় মুমুকে উদ্দেশ্য করে বলল
"আপনারও কোনো রাইট নাই আমার মক্কেলকে ঘুষখোর বলে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার। আপনিই তো বললেন বৃষ্টি তিনটি খুন করেছে। তাহলে তো প্রমাণ হয়েই যায় সে খু/নী।"
এরপর তিনি জজকে উদ্দেশ্য করে বললেন
"মহামান্য আদালত বিপরীত পক্ষের উকিলও স্বীকার করেছেন বৃষ্টি তিনটি খু/ন করেছে। তাহলে এখানে প্রমাণ হয়েই যায় সে খু/নী। নতুন করে প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে না। প্রমাণ অনুযায়ী আমি আপনার কাছে এ খু/নীর সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ফাঁসি চাই।"
এডভোকেট তরুন রায়ের কথায় ব্যাগড়া বসিয়ে মুমু আবারও বলল
"মহামান্য আদালত বৃষ্টি তিনটে খু/ন করেছে এটা প্রমাণ হয়েছে ঠিকই কিন্তু কেন খু/ন করেছে? খু/নের কারণ কী? সেটা বিবেচনা করা জরুরি। আর সে সাথে তিনটি খু/নের প্রমাণ হলেও মেঘের খু/নী কে সেটা প্রমাণ হয়নি। আমার মক্কেল বৃষ্টি তিনটি খু/ন স্বীকার করেছে। সে যদি মেঘকেও খু/ন করত স্বীকার করে নিত। এখন কী এ তিনটি খুন করেছে বলে আরেকটি খুনের ভার তার উপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে? নিশ্চয় যাবে না। তাহলে কেন আরেকটি খুন কে করেছে সেটায় মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না৷ আমার মক্কেলের শাস্তির দাবিই করা হচ্ছে শুধু। অবশ্যই জানতে হবে মেঘের খু/নী কে? মেঘ কেন খু/ন হয়েছিল। নাহয় একজন আসামী তো খু/ন করেও বাইরে ঘুরাফেরা করবে৷ শাস্তি পাবে না। অবশ্যই মেঘের খু/নী কে? কারা খুনে জড়িত ছিল তাদেরও শাস্তি দেওয়া জরুরি৷ আমি কোর্টে আজকে সেটাই প্রমাণ করব কীভাবে মেঘ খু/ন হয়েছে আর বৃষ্টি কেন মেঘের পরিবারকে খুন করেছে। এরপর আপনি যা সিদ্ধান্ত নিবেন মেনে নিব।"
তরুন রায় মুমুর বিপরীতে বলে উঠল
"শুধু শুধু কোর্টের সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই হবে না। আমি আপনাকে প্রমাণ করে দিব কাঠগড়ায় দাঁড়ানো বৃষ্টি মেঘকে খু/ন করেছে।"
এরপর তিনি বৃষ্টির কাছে গিয়ে বললেন
"বলুন আপনি মেঘকে খু/ন করেছেন কি' না?"
বৃষ্টি প্রথমে স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল না। এরপরও পাল্টা একই প্রশ্ন বারবার করা হলে বৃষ্টি উত্তেজিত হয়ে উত্তর দিল না,না।
এরপর যা ঘটল সেটা কেউ এই আশা করে নি।