07/05/2026
তিস্তা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সমবায়ভিত্তিক অর্থনীতি: কৃষি, সংরক্ষণ ও কৃষকভিত্তিক শিল্পের রূপরেখা
নজরুল ইসলাম হক্কানী
তিস্তা নদী উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা হলেও আজ এটি অনিশ্চয়তার প্রতীক—ভাঙন, বন্যা, সেচসংকট ও বাজার বৈষম্যে জর্জরিত। এই বাস্তবতায় “তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ”-এর আন্দোলন শুধু নদী রক্ষার নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের দাবি। সেই পুনর্গঠনের কার্যকর পথ হতে পারে—সমবায়ভিত্তিক কৃষি, সংরক্ষণ ও কৃষকনির্ভর শিল্পায়ন।
সমবায় এমন একটি সংগঠনব্যবস্থা যেখানে কৃষকরা যৌথভাবে উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিপণন পরিচালনা করে। এর ফলে ছোট কৃষকরা একক দুর্বলতা কাটিয়ে সম্মিলিত শক্তিতে পরিণত হয়। তিস্তা অঞ্চলের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে খণ্ডিত জমি, প্রাকৃতিক ঝুঁকি ও বাজারের অস্থিরতা কৃষিকে টেকসই হতে দিচ্ছে না।
কৃষিপণ্য সংরক্ষণ: অপচয় থেকে মূল্য সংযোজন
তিস্তা পাড়ে ভুট্টা, বাদাম, আলু, গম, পেঁয়াজ, আদা ইত্যাদি কৃষিপণ্য প্রচুর উৎপাদিত হয়, কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে কৃষক ন্যায্যমূল্য পায় না। সমবায়ের মাধ্যমে এই সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান সম্ভব।
প্রথমত, সমবায়ভিত্তিক কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম স্থাপন করতে হবে, যেখানে আলু, পেঁয়াজ ও আদার মতো দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যাবে। দ্বিতীয়ত, ভুট্টা ও বাদামের জন্য ড্রাই স্টোরেজ ও সাইলো তৈরি করা জরুরি, যাতে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখা যায়। তৃতীয়ত, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তুলতে হবে—যেমন আলু থেকে চিপস, ভুট্টা থেকে পশুখাদ্য, কর্নফ্লাওয়ার; বাদাম থেকে তেল বা প্যাকেটজাত খাবার; আদা ও পেঁয়াজ থেকে শুকনো বা পাউডারজাত পণ্য। এতে কৃষিপণ্যের মূল্য কয়েকগুণ বাড়বে এবং কৃষক সরাসরি বাজারে অংশ নিতে পারবে।
রাষ্ট্র এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—ভর্তুকি, সহজ ঋণ, প্রযুক্তি সহায়তা এবং অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগের মাধ্যমে। সমবায়গুলোকে এই সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার মালিকানায় রেখে পরিচালনা করলে লাভ সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছাবে।
কৃষকভিত্তিক শিল্পায়ন: সমবায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কৌশল
তিস্তা অঞ্চলে শিল্পায়নের প্রচলিত করপোরেট মডেল প্রায়ই স্থানীয় কৃষকদের উপেক্ষা করে। এর বিকল্প হতে পারে সমবায়ভিত্তিক শিল্পায়ন। রাষ্ট্র যদি নীতিগতভাবে “কৃষক-সমবায় মালিকানাধীন শিল্প” অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
সরকার করতে পারে—
কৃষক সমবায়কে জমি লিজ দেওয়া ও শিল্পপার্কে অগ্রাধিকার
কর অবকাশ ও ভর্তুকি প্রদান
উৎপাদিত পণ্যের সরকারি ক্রয় (public procurement) নিশ্চিত করা
রপ্তানির জন্য বিশেষ সহায়তা ও ব্র্যান্ডিং
সমবায় ব্যবস্থাপনায় পেশাদার প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল সিস্টেম চালু করা
এভাবে সমবায় শুধু উৎপাদনেই নয়, শিল্পের মালিকানাতেও কৃষকদের অংশীদার করবে—যা প্রকৃত অর্থে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে।
কৃষি উপখাতে সমবায় সম্প্রসারণ
তিস্তা অঞ্চলে শুধু ফসল নয়, কৃষির উপখাতগুলোতেও সমবায় গড়ে তোলা জরুরি।
পোল্ট্রি খাত:
সমবায়ভিত্তিক খামার গড়ে তুলে খাদ্য, বাচ্চা, ওষুধ যৌথভাবে ক্রয় করলে খরচ কমবে। সমবায় নিজস্ব ব্র্যান্ডে ডিম ও মুরগি বাজারজাত করতে পারবে।
মৎস্য খাত:
তিস্তার খাল-বিল ও জলাশয়কে সমবায়ের আওতায় এনে মাছ চাষ, পোনা উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ (ফ্রোজেন ফিশ) করা সম্ভব। এতে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।
দুগ্ধ খাত:
গ্রামে গ্রামে দুগ্ধ সমবায় গড়ে তুলে দুধ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত (দই, ঘি, পনির) করা গেলে কৃষক নিয়মিত আয় পাবে। সমবায়ভিত্তিক দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পশুপালন:
গবাদিপশু পালন, প্রজনন, টিকা ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা সমবায়ের মাধ্যমে পরিচালিত হলে উৎপাদনশীলতা বাড়বে। একই সঙ্গে মাংস প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।
এই উপখাতগুলোকে একত্রে “তিস্তা সমবায় সমিতি” বা আঞ্চলিক ফেডারেশনের আওতায় আনলে একটি সমন্বিত কৃষি অর্থনীতি গড়ে উঠবে, যেখানে উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত সব ধাপ কৃষকের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন
সমবায়ের সফলতার জন্য কৃষকদের দক্ষতা বাড়ানো অপরিহার্য। এজন্য প্রয়োজন—
আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও জলবায়ু সহনশীল চাষাবাদ প্রশিক্ষণ
ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ ও নেতৃত্ব উন্নয়ন
ডিজিটাল মার্কেটিং ও ই-কমার্স প্রশিক্ষণ
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ
যুবসমাজকে যুক্ত করে “স্মার্ট সমবায়” গড়ে তোলা গেলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
শেষ কথা
তিস্তা পাড়ের সংকট শুধু প্রাকৃতিক নয়; এটি অর্থনৈতিক কাঠামোরও সংকট। সমবায়ভিত্তিক কৃষি, সংরক্ষণ ও শিল্পায়নের মাধ্যমে এই সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করা সম্ভব। “তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ”-এর দাবিগুলো তাই কেবল আন্দোলনের ভাষা নয়—এটি একটি টেকসই উন্নয়নের বাস্তব রূপরেখা।
রাষ্ট্রের নীতিগত সহায়তা, স্বচ্ছ নেতৃত্ব এবং কৃষকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলে তিস্তা অঞ্চল শুধু টিকে থাকবে না; বরং এটি দেশের সমবায়ভিত্তিক অর্থনীতির একটি সফল মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
লেখক : সভাপতি,তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ