29/07/2025
প্রচন্ড বিরক্তি আর রাগ নিয়ে বাসায় ফিরলাম। এভাবে কি বেঁচে থাকা যায়? বাজারে যেতে যেতে মেজাজ বিগড়ে যায়, চার দিকে শুধু মানুষের ভিড় মানুষের গাড়ি, গাড়ির ধোঁয়া,হৈ হুল্লোড়, চেঁচামেচি! বাজারে মানুষ গিজগিজ করছে, কোন রকম বাজারে ঢুকে পন্যের মাত্রাতিরিক্ত দাম শুনে চিন্তা করি, এজন্যই বোধহয় আজকাল হার্ট এ্যাটাকের সমস্যা এত বেড়ে গেছে। আর এসব কিছুর মূলেই কিন্তু মানুষ! যা হোক অনেক চিন্তা ভাবনা করে বাজার শেষে বাড়ি ফেরার সময় আবারও কিছু নিত্য ঘটে যাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরতেই স্ত্রীর প্যানপ্যানানী শুরু হয়ে গেল।
পাঙ্গাস মাছ আনলে কেন, আলু এত ছোট কেন, পেঁয়াজ আননি কেন, এই করলা কি মানুষ খায় ? এতো তিতা! আরো কত কি!
গরমে ঘামে শরীরের কাপড় প্রায় ভিজে গেছে। দ্রুত রুমে গিয়ে ফ্যানের সুইচ অন করলাম। দু-চার পাক ঘুরতে না ঘুরতেই বিদ্যুৎ চলে গেল। হাত পাখার বাতাস খেতে খেতে ভাবছি " এই স...ব কিছুর জন্য মানুষ দায়ী, এতসব চাহিদা কে পূরণ করতে পারে? এত মানুষ যে আল্লাহ কেন দিয়েছন? কি প্রয়োজন ছিল? চারদিকে শুধু অভাব আর অভাব। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম।
হঠাৎ এসব কি শুনছি! লোকে বলাবলি করছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাকি শরু হয় যাবে ! তাড়াহুড়ো করে বাসায় গিয়ে রেডিও অন করলাম। খবর শুনে মাথা ঘুরে গেল। যুদ্ধ নাকি শুরু হয়ে গেছে! হায় আল্লাহ এখন কি হবে? এত ঘন বসতির দেশ, এ দেশের মানুষ পালাবে কোথায়?
একি শুনলাম, পারমাণবিক বোমার ব্যবহার নাকি শুরু হয়ে গেছে। দেশে দেশে লাখে লাখে মানুষ মরছে। চোখের সামনে একজন আরেকজনকে পরম মমতায় হারানোর ব্যথা অনুভব করে বুকে টেনে নিচ্ছে। জানি না মানুষ মানুষকে মেরে কি যে শান্তি পাচ্ছে!
সাঁই করে মাথার উপর দিয়ে একটি বোমারু বিমান চলে গেল। হঠাৎ ধুম্ করে মাটি কাঁপানো একটি শব্দ হলো। সাথে সাথে একটা পাখি আমার সামনে পড়েই ধরফর করে মরে গেল। ভয়ে আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। হঠাৎ আচমকা কিসের ধাক্কায় আমিও যেন অজ্ঞান হয়ে গেলাম।
জ্ঞান ফিরে পেয়ে অনেক কষ্টে উঠে বসলাম। মাথায় অনেক যন্ত্রনা অনুভব করছি। মাথায় হাত দিতেই মাথা বাম পাশে অনেক ফোলা মনে হল। দু বার দাঁড়ানোর চেষ্টা বৃথা গেল। তৃতীয়বার পাশে কিছু একটা ধরে উঠে দাঁড়ালাম। ধীরে ধীরে হাটছি। হঠাৎ আমার মা,বাবা, ভাই , বোন, স্ত্রী আর সন্তানদের কথা মনে পড়লো। ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলাম। গ্রামে ঢুকে বাড়িতে যাওয়ার পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেখি অনেক মানুষের লাশ পরে আছে। অনেক বাড়ি ঘর মাটির সাথে মিশে গেছে। বুকের ভেতরটা শঙ্কায় দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে , শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তারাতাড়ি বাসায় পৌছে এত ডাকাডাকির পরও কারো সাড়া পেলাম না। ঘরগুলো প্রায় ভেঙে গেছে। কারো একটা লাশও পেলাম না। তবে কি ওরা বেঁচে আছে? কিন্তু কোথায় আছে? চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলাম। কাঁদতে কাঁদতে সন্তানদের নাম ধরে ডাকলাম, মাকে ডাকলাম, কিন্তু কেউ তো নাই। আশেপাশে খোঁজাখুঁজি করলাম। গোটা এলাকায় জীবিত একটা মানুষ খুঁজে পেলাম না। কাকে জিজ্ঞেস করবো ওদের কথা? কয়েক দিন পর লাশের গন্ধে এলাকার কোথাও টিকতে পারছি না, মুহুর্তে মুহূর্তে যেন এর তিব্রতা বেড়েই চলেছে। প্রিয়জনের আশায় বুঝি এলাকায় আর থাকতে পারব না।
আজ কতদিন গত হয়ে গেল আজও প্রিয়জদের কোন হদিস পেলাম না ! কত কত জায়গা ঘুরলাম, কোথাও একটা মানুষ নাই, পশু নাই , পাখি ও নাই। মনে হচ্ছে গোটা পৃথিবীতে আমি একা বেঁচে আছি। কেন যে আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এজন্যই এখন কষ্ট বেশি হচ্ছে। বেঁচে থাকার জন্য অন্তত একটা কথা বলার মানুষ তো প্রয়োজন! এতদিন "মানুষ "এত বেশি কেন এর জন্য বিরক্তি অনুভব করতাম আর আজ একটা মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছি প্রচন্ড পিপাসার্ত প্রাণী যেমন পানি খুঁজে ঠিক তেমনি করে। কোথায় পাবো একটা মানুষ! হোক না সে যে কোন ধর্মের, যে কোন পেশার, ধনী কিংবা গরীব, ছেলে কিংবা বুড়ো অথবা অন্য কেউ, আমার শুধু একটা মানুষ চাই, একটা মানুষ, একটা মানুষ!!
চারদিক নিস্তব্ধ, নীরব, গোটা পৃথিবী মনে হয় জনশূন্য হয়ে গেছে, ভেঙে গেছে ঘর বাড়ি, আফিস, আদালত, নাই কোন নিয়ম কানুন, নাই কোন হুমকি, নাই কোন ভয়, নাই কোন অংশিদার। মনে হচ্ছে গোটা পৃথিবীর মালিক একা আমি! কিন্তু এতকিছুর পরও বুক ফেটে শুধু কান্না আসছে, চিৎকার করে বলছি " আমি জনপূর্ণ বসতি চাই, আমি কোলাহল চাই, আমি কোলাহল চাই, আমি মানুষ চাই, আমি মানুষ চাই।
হঠাৎ পাশে থেকে স্ত্রী ডাক দিয়ে বলল - ঐ তোমার কি হয়েছে? কাঁদছ কেন, ঘুমের ঘোরে কি আবল তাবল বকছো?
স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে আরও বেশি কাঁদলাম, সাথে সন্তানদেরকেও জড়িয়ে নিলাম বুকে।
আজকে বাইরের পরিবেশ ঠিক আগের মতই আছে কিন্তু আমার মধ্যে সেই বিরক্তি নেই। প্রতিটি মানুষকে আজ আমার অনেক আপন মনে হচ্ছে। (S.F.)