22/01/2025
ফুড বিজনেসের মাফিয়ারা
আমাদের ময়মনসিংহ শহরে সাম্প্রতিককালে, ঢাকার দুইটি কাচ্চি রেস্টুরেন্টের শাখা খোলা হয়েছে। যখন রেস্টুরেন্টগুলোর উদ্ভধন হয় তখন সে কি হাইপ, পুরা ফেসবুকে ফুড রিভিউতে সয়লাব। মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাড়িয়ে থেকেছে এক প্লেট কাচ্চির জন্য। ব্যাপারটা এমন, এরা বাপের জন্মে কাচ্চি দেখে নাই, এই প্রথম খাচ্ছে। আমার কাছের ভাই ব্রাদারেরা ইতিমধ্যে কাচ্চি খেয়ে এসে, তাদের বাজে অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। সমস্যা হচ্ছে এই অভিজ্ঞতা নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, কারন নিজের প্রোফাইল বা নিজের সার্কেল ছাড়া সেগুলো প্রকাশের সুযোগ নেই। ফুড রিলেটেড গ্রুপগুলো সব ফুড মাফিয়ারা চালায়। এদের হাত অনেক শক্তিশালী। আপনার কোন নেগেটিভ রিভিউ পোষ্ট তার পাবলিশ করবে না। কারন সব আগে থেকেই সেটেল করা। তবে হ্যাঁ, তারা মাঝে মাঝে নেগেটিভ রিভিউ দেয়, তবে সেগুলো কোন রেস্টুরেন্টকে টাইট দেয়ার জন্য। হায়েনা যেমন দলবদ্ধভাবে শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তেমনি তাদের পেইড রিভিউয়ারেরা নেগেটিভ রিভিউ দিয়ে, সেই নিদ্বিষ্ট রেস্টুরেন্টের বারোটা বাজিয়ে দেয়। শুনেছি শহরের রেস্টুরেন্টদের এদেরকে দাহিদা মাফিক ফ্রি খাবার সারভ করতে হয়, এবং চাঁদা দিয়ে চলতে হয়। না হলে নেগেটিভ রিভিউ দিয়ে সেগুলোর বারোটা বাজিয়ে দেয়া হয়। বহু বছর ধরে এসব চলে আছে। দেখার কেউ নেই। মাঝে কয়েকটা টিভি চ্যানেল এসব ফুড মাফিয়াদের নিয়ে নিউজ করেছিল, ব্যাস এতটুকুই। সবাই সবকিছু জানে কিন্তু প্রতিবাদ করার কেউ নেই।
রেস্টুরেন্টগুলো চালু হবার প্রায় দেড় মাস পরে, শহরে একটা কাজে গিয়েছিলাম। দুপুর বেলা বেশ খিদে লেগে গিয়েছিল। সামনেই দেখি সেই কাচ্চির এক শাখা, দুপুর বেলা প্রচণ্ড ভিড়। কি মনে করে ভাবলাম একটু ট্রাই করে দেখা যাক। গেটে ম্যানেজার মত একজন দাড়িয়ে, আমি ঢুকতেই জিজ্ঞেস করল, স্যার আপনারা কত জন? যখন জানল আমি একা, তখন আমাকে এক ওয়েটারের সাথে ভিতরে পাঠিয়ে দিল। ওয়েটার আমাকে একটা টেবিলের এক কোনে বসিয়ে দিল। কাচ্চির অর্ডার করলাম, সাথে বাদামের শরবত। বেশ অনেক্ষণ অপেক্ষা করার পর কাচ্চি এল, বড় প্লেটে উপচে পড়া রাইসের সাথে দুই পিস মাটন দেখা যাচ্ছে, আর সাথে প্রচুর ঘন ঝোল, যাকে এখন আমরা গ্রেভি বলি। দেখে জিভে জল চলে এল। আমি একটা লম্বা হাড্ডি আর ঝুরা মাংস দিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। বড় মাটনের টুকরাটা পরে আয়েশ করে খাব। বড় মাটনের টুকরা প্লেটে নিয়ে আমি পুরা আবুল হয়ে গেলাম। যেটাকে আমি বড় মাটনের টুকরা মনে করেছিলাম, সেটা আসলে বড় একটা আলুর টুকরা। এত বেশি গ্রেভি দিয়ে সেটা পরিবেশন করা হয়েছে যে, সেটাকে আলু বলার কোন সুযোগ নাই। এর মানে হচ্ছে আমাকে দুই পিস মাটনের বদলে একটা হাড্ডি আর কিছু ঝুরা মাংস দিয়েছে। মেজাজ পুরা খারাপ হয়ে গেল। ওয়েটারকে ডেকে অভিযোগ দিলাম। সে বলল স্যার আপনি আগে বললে চেঞ্জ করে দিতাম। আপনাকে দুই টুকরা মাটন আর এক পিস আলু দেয়া হয়েছে। একটা চিকন মাংস ছাড়া হাড্ডি, আর কিছু ঝুরা মাংস কিভাবে দুই পিস মাটন হয়। বুঝলাম আমার সাথে পুরা বাটপাড়ি করা হয়েছে। খাওয়ার ইচ্ছাই উবে গেল। শুকনা রাইস আর গলা দিয়ে নামছিল না। আমি আশপাশে পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম, সবাইকেই এই একই স্টাইলে খাবার সারভ করছে। কেউ কোন অভিযোগ জানাচ্ছে না। অভিযোগ দেবে কি, সবাই ছবি আর ভিডিও করতে ব্যাস্ত, কেউ কেউ দেখি ফেসবুকে লাইভও করছে। মহিলারা এত সাজুগুজু করে এসেছে যেন কোন বিয়ের বাড়িতে দাওয়াত খেতে এসেছে। কি আর বলব, আমি বাকি খাবার না খেয়ে, বিল দিয়ে দ্রুত বের হয়ে এলাম। মেজাজ পুরাই খারাপ হয়ে গেল। রাতেই ফুড গ্রুপে একটা রিভিউ দেব ভাবলাম। পরে বাদ দিলাম, কারন জানি পবলিশ হবে না। শুধু শুধু বেকার খাটনি খাটা হবে।
আজকে কোন একটা কারণে এই ঘটনা মনে হল, তাই মনের ঝাল মিটাবার জন্য অভিজ্ঞতাটা লিখলাম। আসলে বেশিরভাগ রেস্টুরেন্টে এভাবেই কাস্টমারদের ঠকানো হয়। আমরা আসলে ফুড মাফিয়াদের কাছে জিম্মি। ইদানীং ব্যাঙ্গের ছাতার মত ফুড রিভিউয়ার বের হয়েছে। সামান্য কিছু টাকা বা দুই পিস বাড়তি মাংসের লোভে সবাই এখন ফুড রিভিউয়ার। এরাও ফুড মাফিয়াদের অংশ, ফেক রিভিউ, ভুল তথ্য দিয়ে এরা আমাদের বিভ্রান্ত করে। এক নামকরা ফুড রিভিউয়ারের রিভিউ দেখে, ঢাকার এক হোটেলে খেতে গিয়ে দেখা গেল, নর্দমার পাশে সেই হোটেল আর দুই পাশে দুইটা কসাইয়ের দোকান। দুর্গন্ধে টেকা দায়। এভাবে লিখতে গেলে লিখে শেষ করা যাবে না। আর রেস্টুরেন্টগুলোতে খাবারের পাশাপাশি আরো কি হয় সেটা আমরা সবাই জানি। আমাদের বাজারেই একটা রেস্টুরেন্ট আছে, কিছু দিন পর পর, পুলিশ রেইড দিয়ে স্কুল কলেজ টাইমে ছেলে মেয়েদের গ্রেফতার করে থানায় ধরে নিয়ে যায়। পরে অভিভাবকেরা মুচলেকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। এসব দেখলে লজ্জায় মাথা কাটা যায়।
৭/৮ বছর আগের কথা, আমাদের উপজেলায় কোন চিকেন ফ্রাই বা বিরিয়ানি পাওয়া যেত না। একটা রেস্টুরেন্ট ছিল, সেখানে অর্ডার দিলে তারা চিকেন ভেজে দিত, এতে বেশ সময় লাগত। আমার বাচ্চারা চিকেন ফ্রাই খুব পছন্দ করে, তাই ওদেরকে নিয়ে মাঝে মাঝে সেখানে যেতাম। সেই রেস্টুরেন্টের টেবিলগুলো বেড়া দিয়ে আড়াল করা যেত। বাচ্চাদের নিয়ে খেতে যেয়ে, প্রায়ই সেসব বেড়ার আড়াল থেকে আপত্তিকর শব্দ শুনতে পেতাম। বাচ্চারা ছোট ছিল বলে কিছু বুজত না, জিজ্ঞেস করত বাবা এসব কিসের শব্দ? তাদের মিথ্যে কথা বলতে হত, আর লজ্জায় আমার কান গরম হয়ে যেত। একবার একটা ঘটনা মনে আছে, বাচ্চাদের নিয়ে বার্গার আর চিকেন ফ্রাই খাচ্ছি, এমন সময় দেখি একজন লম্বা মধ্য বয়স্ক লোক, সাথে আল্প বয়সী একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছে। একটা টেবিলে বসে, ওয়েটারকে ডেকে বলল, পেপসি বা সেভেনাপ আছে কিনা? সে বলল বসেন, নিয়ে আসছি। ওয়েটার দুইটা বিদেশী সফট ড্রিঙ্কসের ক্যান, দুইজনের সামনে রেখে, ক্যানের মুখ খুলে দিয়ে বলল, থাইল্যান্ডের মাল, ভাল জিনিস, খেয়ে দেখেন অনেক মজা পাবেন। লোকটা কিছুটা প্রতিবাদের সুরে বলল, আমি চাইলাম 7-up আর আপনারা এ কি দিলেন? ওয়েটার বলল এসবত আপনাদের জন্যই আনা, আপনারা না খেলে কে খাবে। লোকটা দাম জিজ্ঞেস করল। ওয়েটার বলল ৩৫০ টাকা করে ক্যান, মানে দুইটা ক্যানের দাম ৭০০ টাকা। আমি স্পষ্ট বুঝলাম, লোকটাকে ব্লাকমেইল করা হচ্ছে। লোকটা কোন প্রতিবাদ না করে, মুখ বিকৃত করে, সেই ক্যান চুমুক দিয়ে খেতে লাগল।
আমাদের এই ছোট উপজেলার, ছোট একটা রেস্টুরেন্টে এসব নোংরামি হয়, তাহলে বড় বড় শহরগুলোর রেস্টুরেন্টগুলোতে কি হয় সেগুলো সহজেই অনুমেয়। আর ঢাকার কথাত বাদই দিলাম। আসলে আমাদের দেশের পুরা ফুড সেক্টর এসব ফুড মাফিয়াদের দক্ষলে। ফ্যামিলি নিয়ে একটু আরাম করে, সাশ্রয়ী দামে ভাল পরিবেশে ভাল খাবার খাওয়ার সুযোগ পাওয়া খুবই দুষ্কর। এর পরেও আমাদের সচেতন হতে হবে, যেন এসব মাফিয়াদের হাত থেকে আমরা বাঁচতে পারি। এর বাহিরেত আর কিছু করা দেখি না।