06/06/2025
ত্যাগের মহাসংস্কৃতি
ঈদুল আজহার প্রভাতের স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত হয় এক মহিমান্বিত ত্যাগের দিন। এই দিনের মাহাত্ম্য কেবল পশু কুরবানিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা অন্তরের পশুত্ব ত্যাগের এক বিরাট শিক্ষা দেয়। কুরবানির প্রকৃত অর্থ আত্মনিবেদন—আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানির এক নিয়ম করে দিয়েছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু কুরবানি করে। তোমাদের ইলাহ একমাত্র ইলাহ, অতএব তাঁরই অনুগত হও।”
(সূরা হজ: ৩৪)
ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখি, ইব্রাহিম (আ.) যখন স্বপ্নে আদিষ্ট হলেন তার প্রিয় পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করতে, তখন বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে তিনি সে আদেশ পালনের সিদ্ধান্ত নিলেন। আর ইসমাঈল (আ.)-এর জবাব ছিল:
“হে পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন, তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।”
(সূরা ছাফফাত: ১০২)
এই ঘটনা শুধু ইতিহাস নয়, এক চিরন্তন ত্যাগের নিদর্শন। ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই ত্যাগ আল্লাহর কাছে এমনভাবে গৃহীত হয়েছিল যে, তা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের জন্য এক সুন্নাহরূপে নির্ধারিত ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“কুরবানির দিনে আদম সন্তানের কোনো কাজ আল্লাহর কাছে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে অধিক প্রিয় নয়। নিশ্চয়ই কুরবানির পশু কিয়ামতের দিন তাদের শিং, খুর ও লোমসহ আগমন করবে। রক্ত জমিনে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যায়। অতএব, খুশিমনে কুরবানি কর।”
(তিরমিজি: ১৪৯৩)
কুরবানি যেন হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, সামাজিক দম্ভ প্রদর্শনের জন্য নয়। কুরবানির পশু যত বড়ই হোক, যদি নিয়ত বিশুদ্ধ না হয়, তবে তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয় না।
“আল্লাহর কাছে পশুর গোশত ও রক্ত পৌঁছায় না; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”
(সূরা হজ: ৩৭)
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কুরবানি শুধু বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আত্মার ভেতরের খাঁটি নিবেদনই কুরবানির মূল।
আজকের সমাজে কুরবানি এক রকম সামাজিক প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে—কে বড় গরু কাটে, কে সুন্দর ছবি তোলে। অথচ প্রকৃত কুরবানি হলো আত্মপরিশুদ্ধির এক উপায়, ধনীদের সহমর্মিতা প্রকাশের একটি মাধ্যম। দরিদ্র, অসহায়, ও প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত করাও এই ইবাদতের অংশ।
আসুন, আমরা যেন এই কুরবানির মাধ্যমে শুধুমাত্র পশু নয়, বরং নিজেদের অহংকার, হিংসা, কৃপণতা ও সব ধরণের পাপময় প্রবৃত্তিকেও কুরবানি করি। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অন্তর থেকে কিছু ছাড়ার মানসিকতা গড়ে তুলি।
এই হোক কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা—ত্যাগ, তাকওয়া ও আল্লাহর প্রেমে আত্মবিসর্জন।
লেখা - Shah Nesarullah মুহতারাম ছোট হুজুর কেবলা (মা:জি:আ:)