16/05/2026
প্রবাস থেকে টার্গেটেড ক্যাম্পেইন! নাজমুস সাকিবের ফটোকার্ড রাজনীতি ‘টাকা দাও, নয়তো ’?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক রাজনৈতিক ও অনুসন্ধানধর্মী কনটেন্ট নির্মাণ বাংলাদেশের গণমাধ্যম বাস্তবতায় নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত এক দশকে ইউটিউব, ফেসবুক ও বিকল্প ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ব্যক্তি-নির্ভর মিডিয়া ব্র্যান্ড। মূলধারার গণমাধ্যমের বাইরে দাঁড়িয়ে কেউ নিজেদের “নাগরিক সাংবাদিক”, কেউ “স্বাধীন বিশ্লেষক”, আবার কেউ “প্রবাসী কণ্ঠস্বর” হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।
তবে এই নতুন ধারার মধ্যেই জন্ম নিয়েছে বিতর্ক, বিভ্রান্তি এবং অপসাংবাদিকতার অভিযোগ।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে সাম্প্রতিক সময়ে বারবার উঠে এসেছে ফ্লোরিডাপ্রবাসী কনটেন্ট নির্মাতা ও কথিত সাংবাদিক নাজমুস সাকিবের নাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পরিচালিত প্ল্যাটফর্ম এবং কনটেন্ট ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন,সমালোচনা ও অভিযোগ রয়েছে। সমালোচকদের দাবি, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে তিনি ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা একটি নির্দিষ্ট কৌশলে ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে ধারাবাহিকভাবে চাপ সৃষ্টি করেন।
নাজমুস সাকিব নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে দাবি করলেও তার প্রধান হাতিয়ার কোনো বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ নয়, বরং চটকদার ‘ফটোকার্ড’। দেশের বাইরে বসে নিরাপদ দূরত্বে থেকে তিনি ফেসবুক ও ইউটিউবে নিয়মিত বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ান। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাকিবের মূল লক্ষ্য থাকে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা এবং টার্গেটেড ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে হেয় করা। সাংবাদিকতার নূন্যতম নীতিমালার তোয়াক্কা না করে তিনি যেভাবে একতরফা আক্রমণ চালিয়ে যান, তা মূলত একটি সুসংগঠিত সাইবার মাফিয়াগিরি ছাড়া আর কিছুই নয়।
সাংবাদিকতা নাকি টার্গেটেড ডিজিটাল ক্যাম্পেইন?
নাজমুস সাকিবের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো —তিনি জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বৃহৎ ইস্যু নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধান না করে বরং নির্দিষ্ট ব্যক্তি, শিল্পগোষ্ঠী বা ধনী ব্যবসায়ীদের কেন্দ্র করে কনটেন্ট তৈরি করেন। সমালোচকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার অধিকাংশ পোস্ট ও ফটোকার্ডে দেখা যায় একই ধরনের টার্গেটেড আক্রমণাত্মক উপস্থাপন, যেখানে অভিযোগের তুলনায় নাটকীয়তা ও ব্যক্তিগত আক্রমণের মাত্রা বেশি থাকে।
নাজমুস সাকিবকে ঘিরে অন্যতম অভিযোগ হলো,তার পোস্টগুলোতে ধারাবাহিকভাবে এমন ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বা বিত্তশালী ব্যক্তিদের টার্গেট করা হয়, যাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত আলোচনার সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রথমে “অনুসন্ধান চলছে”, “মুখোশ উন্মোচন হবে” বা “বড় তথ্য আসছে”-এ ধরনের ভাষায় ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। এরপর অভিযুক্ত পক্ষ সাড়া না দিলে শুরু হয় ধারাবাহিক পোস্ট, ভিডিও ও লাইভ অনুষ্ঠান।
তার ফেসবুক আইডি ও ইউটিউব চ্যানেল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, থার্মেক্স গ্রুপ,ইউনাইটেড গ্রুপ, হামিম গ্রুপ কিংবা আল-হারমাইন গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘অনুসন্ধান’ শুরুর ঘোষণা দিয়ে প্রথমে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করেন সাকিব। এটি মূলত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতি একটি প্রচ্ছন্ন হুমকি- ‘টাকা দাও, নয়তো ইজ্জত হারাও’। আশ্চর্যজনকভাবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে এই ফটোকার্ডের পর আর কোনো ভিডিও রিপোর্ট বা ফলোআপ আসে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, পর্দার আড়ালে বড় অঙ্কের ডলারের লেনদেন সম্পন্ন হলেই সাকিবের সেই ‘অনুসন্ধানী তেজ’ কর্পূরের মতো উবে যায়। যা প্রমাণ করে, তার সাংবাদিকতা মূলত ‘চাঁদা আদায়ের হাতিয়ার’।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকৃত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার একটি মৌলিক নীতি হচ্ছে তথ্যের বহুমাত্রিক যাচাই, অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন এবং নিরপেক্ষ ভাষা ব্যবহার। কিন্তু কনটেন্ট নির্মাতা নাজমুস সাকিবের ক্ষেত্রে অভিযোগ উত্থাপনই হয়ে ওঠে তার মূল উদ্দেশ্য; পরবর্তী অনুসন্ধান বা আইনি ফলাফল আর সামনে আসে না। ফলে প্রশ্ন ওঠে সাকিবের -এসব কনটেন্ট জনস্বার্থে তৈরি, নাকি এগুলো মূলত সামাজিক ও মানসিক চাপ তৈরির মাধ্যম?
‘ফটোকার্ড সাংবাদিকতা’ নিয়ে বিতর্ক
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অনলাইন রাজনীতিতে “ফটোকার্ড” একটি নতুন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছোট ছোট গ্রাফিক ডিজাইনের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা, অভিযোগ বা চরিত্রহননের প্রচারণা চালানো এখন নিয়মিত ঘটনা। সমালোচকদের অভিযোগ, এই সংস্কৃতিকে আক্রমণাত্মক ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছেন প্রবাসী কনটেন্ট নির্মাতা নাজমুস সাকিব।
সাকিবের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হওয়া একাধিক ব্যক্তির ভাষ্যমতে, যখনই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তার দাবিকৃত অনৈতিক সুবিধা দিতে অস্বীকার করে, তখনই শুরু হয় তার ভয়ংকর ‘চরিত্র হনন’ বা ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশেন। বানোয়াট তথ্যের সাথে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার এবং চটকদার গ্রাফিক্স কার্ডের মাধ্যমে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পারিবারিক ও পেশাগত মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই সিন্ডিকেট কেবল অনলাইনে পোস্ট দিয়েই ক্ষান্ত হয় না, বরং বুস্ট করে সেই মিথ্যাকে ছড়িয়ে দিতে মোটা অঙ্কের অর্থও বিনিয়োগ করে।
নাজমুস সাকিবের সমালোচকেরা দাবি করেন,তার পরিচালিত প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত বহু ফটোকার্ডে ব্যক্তির ছবি, আর্থিক অভিযোগ, পাচার, দুর্নীতি বা রাজনৈতিক যোগসাজশের মতো গুরুতর ইঙ্গিত থাকলেও সেগুলোর সমর্থনে পর্যাপ্ত নথি বা অনুসন্ধান প্রকাশ করা হয় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় “অনুসন্ধান চলমান” বলা হলেও পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আর প্রকাশ পায় না।
এ কারণে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন-এই কৌশল কি আসলেই সাংবাদিকতার অংশ, নাকি সামাজিক ও ব্যবসায়িক চাপ প্রয়োগের একটি ডিজিটাল পদ্ধতি?
জনস্বার্থের ইস্যুতে নীরবতা, বিতর্কে সক্রিয়তা
নাজমুস সাকিবের বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো, দেশে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বড় বড় জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যু-যেমন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যখাতের সংকট, বন্যা পরিস্থিতি, শ্রমিক অসন্তোষ, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা বা জননিরাপত্তা-এসব বিষয়ে তার প্ল্যাটফর্মে ধারাবাহিক আলোচনা খুব কম দেখা যায়। বরং তার কনটেন্টের বড় অংশ জুড়ে থাকে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক আক্রমণাত্মক পোস্ট।
সমালোচকদের মতে, একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিক বা বিশ্লেষকের কাজ কেবল ব্যক্তি আক্রমণ নয়; বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণের বৃহত্তর সমস্যাকে সামনে আনা। কিন্তু যখন কনটেন্টের প্রধান ফোকাস হয়ে দাঁড়ায় নির্দিষ্ট কিছু ধনী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, তখন উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।
সমালোচনা করলেই ‘ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ এখন প্রায় স্বাভাবিক চিত্র। তবে নাজমুস সাকিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ আরও গুরুতর। সমালোচকদের দাবি, কেউ তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলে বা সহযোগিতা না করলে তিনি তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক নেতিবাচক পোস্ট, ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য কিংবা ফটোকার্ড প্রচার শুরু করেন।
কিছু ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অনলাইনে এমন প্রচারণা শুধু ব্যক্তিগত সম্মানহানিই নয়, পারিবারিক ও পেশাগত জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত নেই, তবুও অনলাইন জগতে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মূলধারার সাংবাদিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
পেশাদার সাংবাদিকতার জগতে সাকিবের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। তার ফেসবুক পেজ বা ভিডিওর কমেন্ট সেকশন লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেখানে মূলধারার কোনো প্রথিতযশা সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী বা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা কোনো ইতিবাচক মন্তব্য করেন না। বরং সাধারণ নেটিজেনদের একটি বড় অংশ তাকে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজ’ হিসেবেই চেনে। সাংবাদিকতার ন্যূনতম শিষ্টাচার না থাকায় এবং ভাষাগত অশ্লীলতার কারণে মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীরা সাকিবের নাম উচ্চারণ করাকেও নিজেদের জন্য মানহানিকর বলে মনে করেন।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, ডিজিটাল যুগে যে কেউ কনটেন্ট নির্মাতা হতে পারেন, কিন্তু সাংবাদিকতার পেশার কিছু নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। সেখানে তথ্য যাচাই, ভাষার সংযম, জবাবদিহি এবং সম্পাদকীয় মানদণ্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো অনুপস্থিত থাকলে জনপ্রিয়তা থাকলেও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয় না। আর এখানেই নাজমুস সাকিব চূড়ান্ত ভাবে অকৃতকার্য।
প্রবাসী অনলাইন প্ল্যাটফর্মের উত্থান ও জবাবদিহির সংকট
বাংলাদেশি প্রবাসীদের পরিচালিত বহু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছে। ইউটিউবভিত্তিক টকশো, ফেসবুক লাইভ, ফটোকার্ড ও ছোট ভিডিও এখন রাজনৈতিক প্রচারণার বড় অস্ত্র। কিন্তু এই প্ল্যাটফর্মগুলোর বড় একটি অংশ কোনো সম্পাদকীয় নীতিমালা বা আইনগত কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয় না।
ফলে প্রশ্ন উঠছে -বিদেশে বসে পরিচালিত এসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি কোথায়? যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে টার্গেট করা হয়, তাহলে ভুক্তভোগীরা কোথায় প্রতিকার পাবেন?
আইনি কাঠামো ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
আইনবিদদের মতে, যদি কোনো ব্যক্তি বা প্ল্যাটফর্ম সত্যিই মিথ্যা তথ্য, মানহানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা আর্থিক সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালায়, তাহলে তা ডিজিটাল নিরাপত্তা, মানহানি বা চাঁদাবাজিসংশ্লিষ্ট একইসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ ডিজিটাল মিডিয়া নীতিমালা, যেখানে স্বাধীন মতপ্রকাশ ও জবাবদিহি-দুইয়েরই ভারসাম্য থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, নাজমুস সাকিব একজন উচ্ছৃঙ্খল ও নীতিভ্রষ্ট ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। নিজের ব্যক্তিগত লালসা পূরণের জন্য তিনি কখনো টেক্সি চালক, কখনোবা তথাকথিত সম্পাদকের মুখোশ পরেন। তার এই বেপরোয়া আচরণের কারণে প্রবাসে থাকা সাংবাদিক সমাজও তাকে এড়িয়ে চলে। মূলত কোনো প্রকার জবাবদিহিতা না থাকায় তিনি একটি অনলাইন টর্চার সেল তৈরি করেছেন, যেখান থেকে ডিজিটাল তলোয়ার ঘুরিয়ে তিনি ফায়দা হাসিল করছেন।