11/08/2026
সন্ধ্যা বেলা পড়তে বসা ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট - একজন ছাত্রের হারিয়ে যাওয়া তিন ঘণ্টা
আমাদের জীবন এখন বিদ্যুতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিদ্যুৎ ছাড়া এক মুহূর্তও কল্পনা করা যায় না, বিশেষ করে একজন ছাত্রের জন্য। সন্ধ্যাবেলাটা একজন ছাত্রের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। সারাদিন স্কুল, খেলাধুলার পর এই সময়টাতেই সে মন দিয়ে বই নিয়ে বসে। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যদি বিদ্যুৎ চলে যায়, তাহলে কেমন লাগে, তারই এক বাস্তব চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।
১. সন্ধ্যার প্রস্তুতি - পড়তে বসার মুহূর্ত:
সময় তখন সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিট। বাইরে মাগরিবের আজান শেষ হয়েছে। আকাশে হালকা নীল থেকে কালো রঙ ধরছে। গ্রামের মতো শহরেও এই সময়টা একটু নিরিবিলি হয়ে আসে।
নবম শ্রেণীর ছাত্র ফাহিম তার ছোট্ট ঘরে পড়তে বসলো। ঘরটি খুব বড় নয়। একপাশে কাঠের বুকশেলফ, তাতে অনেক পুরনো বই, একটা ছোট গ্লোব আর বাংলাদেশের মানচিত্র টাঙানো। দেয়ালে দুটো বাংলা ক্যালেন্ডার - একটা ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের, আরেকটা নামতার তালিকা।
টেবিলে তার যুদ্ধের প্রস্তুতি: মাঝখানে বাংলা বই 'বাংলা - নবম শ্রেণি', পাশে 'সাধারণ বিজ্ঞান', সামনে অংক খাতা খোলা। খাতায় সে লিখছিল - x^{2} + 5x + 6 = 0 এর উৎপাদক। পেন্সিল, রাবার, কম্পাস আর এক বোতল পানি। টেবিল ল্যাম্পের হলুদ, উষ্ণ আলো বইয়ের পাতায় পড়েছে। জানালা খোলা, বাইরে থেকে ঠান্ডা বাতাস আসছে। দূরে অন্য বাসাগুলোতে আলো জ্বলছে। মনে মনে সে ঠিক করেছে, আজ রাত ৯টার মধ্যে অংক শেষ করতেই হবে।
২. আকস্মিক অন্ধকার - সব থেমে যাওয়া:
হঠাৎ করেই সব শেষ।
সন্ধ্যা ৭টা বেজে ২ মিনিটে একটা মৃদু 'টিক' শব্দ করে টেবিল ল্যাম্পটা নিভে গেল। ফ্যানের ঘর্ঘর শব্দ থেমে গেল। এক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো ঘর, পুরো বাড়ি, পুরো মহল্লা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল। লোডশেডিং।
ফাহিম প্রথমে চমকে উঠলো। চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। বাইরে তাকিয়ে দেখলো, পাশের বাসার আলোও নিভে গেছে। পুরো এলাকা অন্ধকার। শুধু আকাশে একটা ফ্যাকাশে চাঁদ।
সে মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালালো, কিন্তু মা নিষেধ করলো - চার্জ শেষ হয়ে যাবে। ঘরে মোমবাতিও নেই, গতকালই শেষ হয়ে গেছে। চার্জার লাইটটা চার্জে দেওয়া হয়নি।
বইয়ের পাতা আর দেখা যায় না। অংকের খাতাটা খোলা পড়ে আছে, কিন্তু অক্ষরগুলো অন্ধকারে মিশে গেছে।
৩. অপেক্ষার দীর্ঘ প্রহর - ৭টা থেকে ১০টা:
এরপর শুরু হলো সবচেয়ে কষ্টের সময়। অলস, দীর্ঘ অপেক্ষা।
• ৭:৩০টা: গরম লাগতে শুরু করলো। ফ্যান বন্ধ, ঘামে শার্ট ভিজে যাচ্ছে। মশার দল ভনভন করে কানের কাছে আসছে। • ৮:০০টা: মা রান্নাঘর থেকে ডাকলেন, "ফাহিম, অন্ধকারে বসে না থেকে বারান্দায় যা।" সে জানালার পাশে গিয়ে বসলো। বাইরে তাকিয়ে রইলো। দূরে রাস্তায় রিকশার টুংটাং, মানুষের গল্প, কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। আকাশে চাঁদটা আরও উজ্জ্বল হয়েছে। চাঁদের আলো এসে তার অংক খাতার উপর পড়েছে, কিন্তু পড়ার মতো আলো নয়। • ৯:১৫টা: তার ভীষণ বিরক্ত লাগছে, আবার অসহায়ও লাগছে। মনে হচ্ছে, ইস! যদি এখন বিদ্যুৎ থাকতো, তাহলে এতক্ষণে দুটো অধ্যায় শেষ হয়ে যেত। সময়গুলো কেমন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে বই বন্ধ করে টেবিলে মাথা দিয়ে বসে রইলো। চোখে ঘুম চলে আসছে।
এই তিন ঘণ্টায় সে একবারও পড়তে পারেনি, কিন্তু অনেক কিছু ভেবেছে। আলোর গুরুত্ব কতখানি, তা এই অন্ধকারে বসেই বুঝতে পারলো।
৪. রাত ১০টায় আলোর প্রত্যাবর্তন:
দেয়ালে টাঙানো পুরনো ঘড়িটা যখন ঢং ঢং করে ঠিক ১০টা বাজালো, ঠিক তখনই একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটলো।
ভোঁ করে ফ্যানটা ঘুরতে শুরু করলো। টেবিল ল্যাম্পটা চোখ ধাঁধানো আলো নিয়ে জ্বলে উঠলো। পুরো ঘর আবার আলোকিত।
ফাহিম চমকে উঠে ঘড়ির দিকে তাকালো - রাত ১০টা বেজে ৩ মিনিট। প্রায় ৩ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ এলো।
কিন্তু এখন আর আগের মতো উদ্যম নেই। চোখ জ্বলছে, বারবার হাই উঠছে। বাইরে এখন গভীর রাত, চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। পাশের বাসার সব আলো নিভে গেছে, সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আর সে এখনো অংক খাতা নিয়ে বসে, ক্লান্ত, হাই তুলতে তুলতে। তার সন্ধ্যার পড়াটা আর হলো না, এখন রাত জেগে সেটা পুষিয়ে নিতে হবে।
এটা শুধু ফাহিমের একদিনের গল্প নয়, এটা বাংলাদেশের হাজারো ছাত্রের প্রতিদিনের গল্প। সন্ধ্যার এই ৩ ঘণ্টা লোডশেডিং একজন ছাত্রের মনোযোগ, পরিকল্পনা আর ভবিষ্যৎ সবকিছুকেই অন্ধকারে ঠেলে দেয়। তাই আমাদের উচিত জাতীয়ভাবে বিদ্যুৎ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের চেষ্টা করা।
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী
আপনি তো সকল ছাত্র/ছাত্র-ছাত্রী কে পড়ার টেবিলে দেখতে চান, এই যদি হয় দেশের বিদ্যুৎ এর অবস্থা, তাহলে আর বুঝতে বাকি থাকে না আমরা কোথায় যাচ্ছি?
দেশবাসীর মনে শুধুই শঙ্কা।