31/12/2024
গল্পের নাম: "নানার চা-রুটির দোকান"
নানার নাম নূর মুহাম্মাদ। তিন মামা, দুই খালা ও নানার বৌ, মানে নানিকে নিয়ে সুন্দর গোছানো সংসার। খোলপটুয়ার নদীর পাশাপাশি ব্যস্তময় একটি রেস্টুরেন্টে ছিল নানার বিখ্যাত চা-রুটির দোকান।
কালাই রুটি, বন রুটি, পাউরুটি, পরোটা, চালের রুটি, আটার রুটি আরও কত পদের রুটি যে নানা-নানি নিজ হাতে বানাতো তার কোনো হিসেব নেই। প্রতি চায়ের মূল্য মাত্র ২/= টাকা। আহারে, কি যে মনমাতানো স্বাদ আর সুস্বাদু দিয়ে ভরা দুধ চা ও রং চা!
শীতের সকালে ভাই-বোন মিলে নানার দোকানে চা-রুটি ছিলো প্রাক-নাস্তা আইটেম। এক হাতে চা অন্য হাতে গত রাতের প্রিন্ট করা নতুন খবরের কাগজ। এ যে মহা আনন্দ ও রোজনামচার প্রথম ধাপ তা যার জীবনের ইতিহাসে পাওয়া যায় শুধু সেই বুঝে এর মর্মার্থ।
আল্লাহর ইচ্ছায় ভালোই চলছিল এলাকার সুনামধন্য হোটেলটি। পাশে নদী থাকায় বাহারি পদের মাছ ছিল নিত্য দিনের খাবারের প্রধান মেনু। কথায় আছে না, ভাতে-মাছে বাঙালি! নানার বাসায় মেহমান আসলেই চা-রুটি আর মাছ দিয়ে ভাত না খেয়ে তার ছুটি হতো না। আসুন বসুন চা খান চলে যান!
হঠাৎ নানা ভাইয়ের হাসোজ্জ্বল মুখটি মলিন দেখাতে লাগলো। বয়সের ছাপ ও কাজের ব্যস্ততা একাকার হয়ে তার সুস্বাস্থ্যের কথা মনেই রাখেননি। ডাক আসলো হাসপাতাল থেকে। তিনি কি হার্ট অ্যাটাক করেছেন নাকি বেহুশ হয়ে গেছেন ডাক্তার মশাইয়ের বেশ সময় লাগলো বুঝতে। তার অনুধাবনের পূর্বেই উপস্থিত সবাই আগেই মেনে নিল যে তিনি মহান রবের সান্নিধ্যে ইহলোক ত্যাগ করে ফেরেশতাদের সাথে পরলোকে স্থানান্তরিত হয়ে গেছেন।
চা-য়ের দোকানের ব্যস্তময় দিনগুলি যেন হারিয়ে গেল নিমেষেই! কত মানুষের আনাগোনা আর বাহারি খাবারের রান্নার কড়াই, পাতিল, থালাবাসন, চায়ের কেটলি, উনুনের পাশে রাখা মশলার বাটি গুলো মন খারাপ করে একাকি কান্না করছে। তাদের প্রিয় লোকটি যে আজ আর নেই!
ঢাকায় নাকি গার্মেন্টসে চাকরি করে সবাই নাকি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ লাগাচ্ছে। মানে কাড়ি কাড়ি টাকা কামাচ্ছে। তাই সবাই সিদ্ধান্ত নিল নানিকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে জ্যামের শহরে নতুন কুটিরে বসতি স্থাপন করবে।
কে ধরবে চা-রুটি দোকানের হাল! অবশেষে ছোট খালামনি ও তার হাজবেন্ট মানে খালু, তারাই প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখতে নানার দোকান ক্রয় করে মালিকানা হয়ে গেলো।
দীর্ঘ ৩০ বছর পর। পটুয়াখালী নদীর পাড় যেন আরেক খন্ড গুলশান এলাকা! অলিগলির চেহারা যেন পাল্টে গিয়ে পুরাতন ইতিহাস মুছে ফেলার পায়তারা করছে। কিন্তু না, নানার দোকানটি যেন আজও সেই প্রাচীন রেস্টুরেন্টের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ কাঠামো ঠিক রেখে দাঁড়িয়ে আছে।
কবির ভাষায়,
ঐ দেখা যায় তাল গাছ
ওই আমাদের গাঁ
ঐখানে-তে বাস করে
নানা বাড়ির ছা! (ছোট খালাম্মা ও তার ফ্যামিলি)
খালুর হাসি আর চামড়ার বুড়ো বেলকি যেন ঠিক নানার প্রতিচ্ছবি বারবার মনে করে দিচ্ছে। খালাও যেন নানির চেহারার চুলপাকা বুড়ি।
একটুখানি পর, খালামনি চা-রুটি নিয়ে হাজির। প্রতিটি চায়ের চুমুকে যেন নানার হাতের বানানো চায়ের মতই স্বাদ!
দুচোখ বেয়ে মনের অজান্তেই অশ্রু এসে টপ টপ করে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো। ইশ, সবাই যদি একসাথে মহান সৃষ্টিকর্তার স্বর্গে থাকতে পারতাম!