08/04/2026
দশরথ মাঝি (১৯৩৪ - ১৭ আগস্ট ২০০৭) ভারতের বিহারের গয়া জেলার এক দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক ছিলেন, যিনি অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে একাই একটি পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করেছিলেন। তাকে শ্রদ্ধাভরে 'মাউন্টেইন ম্যান' বা 'পাহাড় কাটা মানুষ' বলা হয়।
দশরথ মাঝির সেই ঐতিহাসিক রাস্তা তৈরির ইতিহাস নিচে দেওয়া হলো:
১. প্রেক্ষাপট ও জেদ
দশরথ মাঝির গ্রাম গেহলৌর এবং নিকটবর্তী শহর উজিরগঞ্জের মাঝে এক বিশাল পাহাড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ১৯৫৯ সালে তার স্ত্রী ফাল্গুনী দেবী পাহাড় পার হয়ে তার জন্য খাবার আনতে গিয়ে পড়ে যান এবং গুরুতর আহত হন। পাহাড় ঘুরে হাসপাতালে যাওয়ার পথ ছিল প্রায় ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে ফাল্গুনী দেবী মারা যান। এই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে দশরথ মাঝি প্রতিজ্ঞা করেন যে, তিনি পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করবেন যাতে আর কেউ সঠিক সময়ে চিকিৎসার অভাবে মারা না যায়।
২. দীর্ঘ ২২ বছরের সংগ্রাম (১৯৬০ - ১৯৮২)
১৯৬০ সালে তিনি একটি হাতুড়ি আর ছেনি নিয়ে একাই পাহাড় কাটা শুরু করেন। শুরুতে গ্রামবাসী তাকে 'পাগল' বলে বিদ্রূপ করত। এমনকি তার পরিবারও প্রথমে তাকে সমর্থন করেনি। কিন্তু তিনি দমে যাননি।
কঠোর পরিশ্রম: প্রতিদিন ভোরে উঠে তিনি পাহাড়ে চলে যেতেন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাথর ভাঙতেন। নিজের খাওয়ার খরচ জোগাতে দিনের কিছু সময় মজুর হিসেবে কাজ করতেন এবং বাকি পুরো সময়টা ব্যয় করতেন পাহাড় কাটায়।
প্রতিকূলতা: খরা, প্রচণ্ড গরম এবং চরম দারিদ্র্য সত্ত্বেও তিনি এক দিনও কাজ থামাননি। ধীরে ধীরে যখন পাহাড়ের বুক চিরে রাস্তা দৃশ্যমান হতে শুরু করল, তখন কিছু গ্রামবাসী তাকে খাবার ও সরঞ্জাম দিয়ে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন।
৩. অবিশ্বাস্য সাফল্য
টানা ২২ বছর হাড়ভাঙা খাটুনির পর ১৯৮২ সালে তিনি তার লক্ষ্য পূরণ করেন। তার তৈরি রাস্তাটি ছিল:
৩৬০ ফুট দীর্ঘ
৩০ ফুট চওড়া
২৫ ফুট উঁচু
৪. প্রভাব ও ফলাফল
তার এই অসাধ্য সাধনের ফলে অত্রি এবং উজিরগঞ্জ ব্লকের মধ্যবর্তী দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার থেকে কমে মাত্র ১৫ কিলোমিটারে নেমে আসে। এর ফলে কয়েক ডজন গ্রামের মানুষের জন্য স্কুল, হাসপাতাল এবং বাজারে যাওয়া সহজ হয়ে যায়।
পরবর্তীতে সরকার তার তৈরি করা এই পথটিকে পাকা রাস্তায় রূপান্তরিত করে এবং বর্তমানে এটি 'দশরথ মাঝি পথ' নামে পরিচিত।