25/10/2024
প্রথমজন - ফাঁকা না আজ দোকানগুলো ?
দ্বিতীয়জন - হুম রে , খুব ফাঁকা, পুজোর পর স্টকও প্রায় শেষের মুখে সেখান থেকেই বেছে মায়ের শাড়ি আর বাবার শার্টটা কিনলাম।
প্রথমজন -ভালোই করেছিস , পুজোর ওই ভিড়ে সত্যি দেখে কেনা যায় না
দ্বিতীয়জন - সেটাই তো ! আর আমার মা বাবাকে তো জানিস বেরোবেই না বাড়ি থেকে।আমি যা এনে দেব কিনে,সেটাই পরবে,দায়সারা জীবন !বড় ছেলের দুঃখে হেদিয়ে মরছে।ছোটো ছেলের প্রতি উদাসীন।
অটোতে বসে থাকা আমার পাশের দুজনের কথাতে একটু অবাক হয়ে গেলাম। পুজো শেষ , আজ বাদে কাল লক্ষী পুজো এখন কেনাকাটা ! ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে ইচ্ছে করলো কিন্তু লজ্জার খাতিরে পারলাম না অগত্যা কান খাড়া করলাম, কলম ধরার পর থেকে আজকাল যেখানে সেখানে আমি যে আড়ি পাতি সেটা অস্বীকার করে লাভ নেই।
প্রথমজন : তোর দাদা আসে না পুজোতে ?
দ্বিতীয়জন : না না , পুজোর দিন এমনি দিন কোনোদিনই আসেনা !না হলে বলনা আমার দাদা যা ইনকাম করে আমার বাবা মায়ের এরকম হয় অবস্থা! আরে শালা আমায় না দেখলি! যে বাপ্ মা জন্ম দিলো তাকে অন্তত দেখ!আমার একটা পেট ঠিক এখান সেখান থেকে চলে যাবে।আর বাবা তো বেকার না পেনশন পায়! খুব বেশী কিছু না কিন্তু চলে যায় দুজনের,একটু ভালোভাবে রাখা শেষ বয়সে এই যা!
প্রথমজন : এ কেমন কথা, তোর চলে যাবে, এবার বিয়ে কর সংসার কর!হোলো তো নয় নয় করে ত্রিশ একত্রিশ বছর । আমার বাড়িতে তো রোজ বিয়ে বিয়ে চলছে।
দ্বিতীয়জন বললো : ভাই তুই একটা ভালো চাকরি করিস লোকে চোখ বন্ধ করে মেয়ে দেবে তোকে! কিন্তু আমায়?
চোখ নাচিয়ে হেসে বললো ছেলেটি , ভাবটা এমন যেন বিষয়টা বেশ গর্বের ওর কাছে।
প্রথমজন বললো : এবার একটা ভালো কাজের খোঁজ কর!
দ্বিতীয়জন : কাজ আর মেয়ে, উপযুক্ত না হলে কেউ দেবে না। বস! আমি উচ্চ মাধ্যমিক ব্যাক পাওয়া ছেলে, ইংরিজি টা বুঝি না ভাই!
প্রথমজন : জানিস তো আমরা আজও বুঝে পাই না যে ছেলেটা অংকে, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি তে এতো ভালো নাম্বার পেলো সে ইংলিশে কিভাবে ব্যাক পেলো? আরও একবার দিতে পারতিস ভাই পরীক্ষাটা তুই! শুধু শুধু জেদ করলি,!
প্রথমজন : ধুস ধুস পাগল হলি, অংক ফিজিক্স কেমিস্ট্রি এগুলো হলেও দিতাম, ইংরেজি টা ছোটো থেকেই বড্ড জ্বালিয়েছে। আজও অতীত বর্তমান ঝাঁপসা লাগে!ওটা আবার দিলে আবার ফেল মারতাম!
বলেই আবার ফিকফিক করে হেসে দিলো। আর না পেরে ঘুরে দেখলাম। চুলটা উস্কখুস্ক, বোকা বোকা একটা সরল মুখ। কিন্তু চোখ দুটো বেশ বুদ্ধিদীপ্ত।বোঝা যায় এ ছেলে বেশ মেধাবী।
প্রথমজন বুঝলো আমি ওদের দেখছি। বন্ধুর লজ্জাটা বোধহয় ও নিতে পারলো না তাই বললো তুই ছোটো থেকেই ইংলিশে কাঁচা তাই সাইন্সে ওতো ভালো মার্কস পেয়েও কাজে লাগলো না।
প্রথমজন বললো : ধুর পড়াশোনার সিস্টেম টাই খারাপ ক্লাস ফাইভ থেকেই পছন্দের বিষয় নিতে দেওয়া উচিত। কি হবে অতদিন অপছন্দের সাথে লড়ে! আমার যে আর তোদের মতো পড়া হোলো না তাতে আমার দুঃখ নেই।
কারণ ওটা টানতে গেলে ইংরেজির কঠিন বানানগুলো , গল্প পড়ে তার উত্তরগুলো, প্রেসি, লেটার এই মাথায় ঢোকাতে হতো! রক্ষা করো তার থেকে এই ভালো।যা কাজ পারি করি লজ্জা নেই। টাকার গরম নেই, বাবা মায়ের সেবা করতে খারাপ লাগে না।
এইতো পুজোর পাঁচদিন একটা বড় প্যান্ডেলে সিকিউরিটি কাজ করলাম। বাড়ি আসতে দেয়নি। ওখানেই ছিলাম।দিন পিছু নশো, বাবা মাকে বললাম দীঘা যাচ্ছি। তেঁনারা আবার লজ্জা পেতেন, সরকারি চাকুরের ছেলে প্যান্ডেলে দড়ি ধরে বাঁশি বাজাচ্ছে। বড় ছেলে আরও আসা বন্ধ করে দিতো। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ভাই প্যান্ডেলে লোকজনকে হাটাচ্ছে!
এই যে সাড়ে চার হাজার ইনকাম করলাম এটা কম? বাবা মাকে পুজোর জামা কিনে দিলাম বাকি টাকায় কাল জমিয়ে লক্ষী পূজো হবে। আসিস ভাই খিচুড়ি খেয়ে যাস।
বলতে বলতে দুই বন্ধুতে নেমে গেলো অটো থেকে।আমি একদৃষ্টে দেখে যাচ্ছি ছেলেটাকে, আমার নামতে বেশ খানিকটা বাকি।
আমি অবাক হয়ে ভাবছি এতো ব্যর্থতা নিয়েও কিভাবে এতো বেঁচে থাকার রসদ পায় এই ছেলেটা!
মানুষ এতো পেয়েও খুশি হয়না এই ছেলেটা কি করে এতো অল্পে খুশি হয়ে যায়! যে ছেলেটা সাইন্সে এতো ভালো সে শুধু ইংলিশ পারে না বলে আর পড়াশোনাই করলো না! এ কি কম ব্যর্থতা!
পুজোয় আনন্দ করবো বলে সারাবছর মুখিয়ে থাকি আমরা সেই পুজোর কটাদিন প্যান্ডেলে ভিড় সামলাতে ব্যস্ত ছিল উচ্চ মাধ্যমিক ফেল করা ছেলেটা!তাও মাত্র নশো টাকার বিনিময়ে!
কিন্তু কি খুশি ওর চোখ মুখে!ওর থেকে কত কিছু শেখার আছে।হেরে গিয়েও ছেলেটি যেন অনেকের থেকে বেশী সফল।
ওকে দেখে মনটা সত্যি খুশি হয়ে গেলো। জীবন যেমনই হোক তাকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই আসল সফলতা। তাহলে কোনো কিছুই টলাতে পারবে না। মনটা সত্যি কেমন ফুরফুরে হয়ে গেলো।
এই জন্যই আজকাল আড়ি পাততে ভালো লাগে। নিজের অজান্তেই অনেক কিছু শিখে ফেলি। কোনো কাজই ছোটো নয়, আড়ি পাতাও না😃।