28/05/2023
// কালীরূপিণী শ্রী শ্রী মা সারদা //
©️ স্বামী গুণালয়ানন্দ
◼প্রথম ঘটনা :-
মাকে কালীরূপে প্রথম দর্শন করেন দস্যু দম্পতি। মনে হয়, পূর্বযুগের মহিষাসুরই এই যুগে ডাকাতরূপে উদয় হয়েছিলেন। প্রথমে হুঙ্কার, তর্জন-গর্জন তারপরেই চরণতলে শরণাগতি। হ্যাঁ, কালী দর্শনের উপযুক্ত পরিবেশই ছিল বটে! একে নির্জন তেলোভেলোর উন্মুক্ত প্রান্তর, তায় রজনীকাল। দস্যুর আরাধ্যা দেবী মানবী কন্যারূপে একাকী উপস্থিত। পরবর্তীকালে শ্রীমা বলেছিলেন, "লোকটা জাতে বাগদী, ডাকাতের মতো রুক্ষ কথায় জিজ্ঞেস করলে, 'তুই কে?' আর আমার পানে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।" যার সঙ্গে মায়ের কথা হচ্ছিল, সেই ভক্ত জানতে চাইলেন, "ডাকাত আপনার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে কি দেখছিল?" শ্রীমা বললেন, "পরে বলেছিল, কালীরূপে নাকি দেখেছিল।" শ্রীমা একদিন নিজে একবার বাগদী দম্পতিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "তোমরা আমাকে এত স্নেহ করো কেন গো?" বাগদী দম্পতি উত্তর দিয়েছিল, "তুমি তো সাধারণ মানুষ নও, আমরা তোমাকে কালীরূপে দেখেছি।"
◼দ্বিতীয় ঘটনা:-
শ্রীরামকৃষ্ণের লীলা সংবরণের পর শ্রীমা একবার পদব্রজে কামারপুকুর থেকে জয়রামবাটী আসছেন। সঙ্গে শিবুদাদা। জয়রামবাটীর কাছে মাঠের মধ্যে এক জায়গায় শ্রীমার মনে হল পিছনে শিবুদাদার পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছেন না। পিছন ফিরে দেখেন, শিবুদাদা বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। মা বললেন, "ও কি রে শিবু?" শিবু দাদা বললেন, "একটি কথা বলতে পারো, তাহলে আসতে পারি।" মা জিজ্ঞাসা করলেন, "কি কথা?" শিবুদাদা বললেন, "তুমি কে বলতে পারো?" মা উত্তর দিলেন, "আমি কে? আমি তোর খুড়ি।" শিবুদাদা বললেন, "তবে যাও, এই তো বাড়ির কাছে এসেছ। আমি আর যাব না।" তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বিব্রতস্বরে মা বললেন, "দেখ দেখি, আমি আবার কে রে? আমি মানুষ, তোর খুড়ি।" শিবুদাদা উত্তর দিলেন, "বেশ তো, তুমি যাও না।" শিবুদাদাকে নিশ্চল দেখে শ্রীমা শেষে বললেন, "লোকে বলে কালী।" শিবুদাদা বললেন, "কালী তো? ঠিক?" মা বললেন, "হ্যাঁ।" তখন শিবুদাদা খুশী মনে হাঁটতে শুরু করলেন।
অনেকদিন পরের ঘটনা। শ্রীমা জয়রামবাটী থেকে কলকাতায় আসবেন। শিবুদাদা দেখা করতে এসে তাঁর শ্রীচরণে মাথা রেখে কাঁদেন আর বলেন, "তুমি আমার ভার নাও, আর তুমি যা বলেছিলে, তুমি তাই কিনা, বল।" শ্রীমা নানাভাবে শিবুদাদাকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু শিবুদাদা কেবলি কাঁদেন আর বলতে থাকেন, "বল, তুমি আমার সকল ভার নিয়েছ, আর সাক্ষাৎ মা-কালী কিনা।" শিবুদাদার এই ব্যাকুলতায় শ্রীমায়ের সহসা ভাবান্তর হল। তিনি শিবুদাদার মাথায় হাত রেখে আত্মস্থভাবে শান্তকণ্ঠে বললেন, "হ্যাঁ, তা-ই।" সেখানে উপস্থিত স্বামী ঈশানানন্দের তখন শ্রীমাকে দেখে স্থির প্রত্যয় হল- শ্রীমা মানবী নন, তিনি সাক্ষাৎ ভগবতী।
◼তৃতীয় ঘটনা:-
স্বামী অরূপানন্দ মায়ের কাছে দীক্ষা নেন। দীক্ষার সময় মা তাঁকে মন্ত্র দিয়েই, পিঠে হাত দিয়ে, অন্য হাতে সামনের দেওয়ালে নির্দেশ করে বলে ওঠেন, “এই, এই তোমার ইষ্ট।” স্বামী অরূপানন্দ চেয়ে দেখেন, সামনের দেওয়ালে জীবন্ত ভবতারিণী। ভয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে মায়ের দিকে তাকাতেই দেখেন মা-ও জীবন্ত কালী-মূর্তিতে বিরাজমানা!
◼চতুর্থ ঘটনা:-
নিশিকান্ত মজুমদার দীক্ষালাভের জন্য আকুল হলে, একদিন রাত্রে স্বপ্ন দেখলেন, কলকাতার কালীঘাটের কালী তাকে চারহাতে কোলে তুলে নিলেন এবং একটি দ্বিভুজা মাতৃমূর্তিতে পরিণত হয়ে স্বপ্নেই তাঁকে বীজ সহ মন্ত্র প্রদান করলেন। এর বহু পরে নিশিকান্তের সঙ্গে জয়রামবাটীতে মায়ের পরিচয় হয়। প্রথম পরিচয়েই নিশিকান্ত মাকে দেখে চমকে ওঠেন। এ যে সেই স্বপ্নে দেখা মাতৃপ্রতিমা! মা-ও নিশিকান্তকে দেখে সহাস্যে রহস্যের ভঙ্গিতে বলে ওঠেন, “কি গো, তুমি আমাকে চিনলে কেমন করে গো! এই তো দেখ দেখি কত জন্ম-জন্মান্তর ঘুরে ঘুরে ঘরের ছেলে আজ ঘরে এয়েছ।”
◼পঞ্চম ঘটনা:-
মা একবার জনৈক ব্রহ্মচারীকে- নিজের, ঠাকুর ও ভবতারিণীর ছবি দেখিয়ে বলেছিলেন- “এঁরা এক, এই সত্যি জানবে।”
◼ষষ্ঠ ঘটনা:-
শিলং-এর ভক্তরা মহোৎসাহে অবিরাম কালী কীর্তনে মেতেছেন, তাঁদের বিশ্বাস তাঁরা মাকে শোনাচ্ছেন। মায়ের সেবক গোপেশ মহারাজ তখন জয়রামবাটিতে। চারিদিক শান্ত, মা হঠাৎ বলে উঠলেন- "ছেলেদের জ্বালায় কান ঝালাপালা হয়ে গেল।" পরে শিলং-এর ভক্তরা এলে গোপেশ মহারাজ ওই কথার রহস্য বুঝে আশ্চর্য হয়ে যান, ভক্তরাও অবাক।
◼সপ্তম ঘটনা:-
কালীঘাট গমনেচ্ছু স্বামী নির্বাণানন্দকে বাবুরাম মহারাজ নির্দেশ দিয়েছিলেন, "উদ্বোধনে মায়ের সঙ্গে দেখা করে যা, তিনিই সাক্ষাৎ কালী। সেখান হয়ে তবে কালীঘাটে যাবি।" মহারাজের মুখে সব শুনে মা হেসে বলেছিলেন, "বাবুরাম ঠিকই বলেছে বাবা।"
◼অষ্টম ঘটনা :-
একবার আরামবাগের ভক্ত প্রবোধচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আশঙ্কা প্রকাশ করেন, শিবুদাদার স্ত্রী ক্ষেপে গিয়ে (পারিবারিক বিবাদে) হয়তো ঠাকুরের ঘরে আগুন ধরিয়ে দেবেন। একথা শুনে শ্রীমা অমনি এক অশ্রুতপূর্ব তীব্রকণ্ঠে প্রতি শব্দ একটু টেনে টেনে বলতে লাগলেন, "তা হলে বে-শ হয়, তা হলে বে-শ হয়! ঠাকুর যেমনটি ভালবাসতেন, তেমনটি হয়। তিনি শ্মশান ভালবাসতেন, সব শ্মশান হয়ে যাবে।" বলেই তিনি হাসতে আরম্ভ করলেন। ক্রমে তা অট্টহাসিতে পরিণত হল। ক্রমে ক্রমে সেই হাসি গ্রামে গ্রামে উচ্চে উঠে এমন তীব্রতর ও গম্ভীরতর হয়ে উঠল যে উপস্থিত সকলের হৃদয়ে ত্রাসের সঞ্চার করল। ভক্তদের বিচলিত দেখে মা সাথে সাথে ভাব সম্বরণ করে কোমল কণ্ঠে অন্য কথা পেড়ে তাদের সব ভুলিয়ে দিলেন।
◼ নবম ঘটনা :-
"শ্রীশ্রীমায়ের পথপ্রান্তে" ( তৃতীয় খন্ড পৃঃ ৭০০), শান্তিরাম দাস লিখেছেন- তিনি এবং তার দিদি দুজনে মিলে শ্রীমা সারদা দেবীর মধ্যে সাক্ষাৎ কালীর রূপ দর্শন করেছিলেন। বলেছেন- “পিসিমার পা-ছড়িয়ে বসা ছবিটা আমার চোখের সামনে যেন জীবন্ত হয়ে ভাসে। বৃদ্ধা কিন্তু দুচোখে কী মমতা! তবে আমি কিন্তু একদিন পিসিমাকে এক অন্য মূর্তিতেও দেখেছিলাম। আমি আর আমার এক দিদি সেদিন পিসিমার নতুন বাড়িতে গিয়েছি। পিসিমা বাড়ির বারান্দায় বসেছিলেন। হঠাৎ দেখলাম পিসিমা উঠে দাঁড়ালেন। অবাক হয়ে দেখলাম, পিসিমার মতো দেখতে, কিন্তু এ কোন্ পিসিমা? যুবতী, ঢলঢল দিব্য কান্তি, পিঠের দিকে চুল সব খোলা যেন পায়ের কাছে ভুঁয়ে ঠেকে গেছে। ঠিক যেন মা-কালীর মতো। দিদিকে ভয়ে ভয়ে চুপিচুপি বললাম: ‘দিদি, পিসিমাকে দ্যাখ। কত চুল পিসিমার মাথায়!’ দিদিও একই দৃশ্য দেখতে পেল। ভয়ে একছুটে দুজনে বাড়ি চলে গেলাম। পিসিমার সেই মূর্তি আজও আমার মনে আছে। পিসিমা আমার নাম রেখেছিলেন ‘শান্তি’। আজ শুধু আমার একমাত্র আকাঙ্ক্ষা কখন পিসিমা আমাকে তুলে নিয়ে পুরোপুরি শান্তি দেবেন! ”
◼ দশম ঘটনা:-
অসুস্থ শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখতে কামারপুকুর থেকে দক্ষিণেশ্বর যাচ্ছিলেন মা সারদা। সন্ধ্যা নেমে গিয়েছে। হঠাৎ ডাকাতির উদ্দেশ্যে তার পথ আটকায় রঘু ডাকাত ও গগন ডাকাতের দলবল। কিন্তু হঠাৎই এই দুই ডাকাত সর্দার মা সারদার চোখে রক্তচক্ষু মা কালীর মুখ দেখতে পায়। এ ঘটনায় রঘু আর গগন নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে সারদা মায়ের কাছে ক্ষমা চান রাত ও সেই রাতের মত মা সারদাকে থাকার ব্যবস্থাও করে দেন। আর সে রাতে মাকে চাল ভাজা, কড়াই ভাজা খেতে দেন।
পরবর্তীকালে সিঙ্গুরে , সেই স্থানে তৈরি করা হয় মায়ের মন্দির। গগন ও রঘু ডাকাত মিলিতভাবে নির্মাণ করে মায়ের মূর্তি। মা এখানে রক্তচক্ষু। প্রাচীন প্রথা মেনে শূদ্রদের আনা গঙ্গা জল দিয়ে শুরু হয় পুজো। চার প্রহরে হয় চারবার পুজো ও ছাগ বলি।
🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺🌺