28/03/2026
এ এক অন্যরকম ভালোবাসা
বইমেলার ভিড়টা আজ একটু অন্যরকম। শুধু বই কেনা বা দেখা নয়, যেন হাজারো গল্পের ভিড়ের মধ্যে নিজের গল্পটাকেও খুঁজে নেওয়ার এক অদ্ভুত তার জন্মেছে। সেই রকমই এক শীতের বিকেলে কলকাতার বইমেলায় শুরু হয়েছিল তাদের গল্প।
রোদ্দুর ও তার বন্ধুদের একটা ছোট্ট গ্রুপ ছিল, পড়াশোনা এবং নানান ব্যস্ততার মাঝেও প্রতি বছর একটা দিন হলেও বইমেলায় যাওয়া তাদের একটা নিয়মের মতো ছিল। হাসিঠাট্টা পুরনো গল্প খাওয়া-দাওয়া, বই কেনা সব মিলিয়ে দারুন দিন কাটত ওদের। সেদিনও তারা সবাই একসাথে ঘুরছিল। কেউ কবিতার বই খুঁজছে, কেউ গল্পের, কেউ আবার শুধু ঘুরেই খুশি আর কেউ খাওয়া-দাওয়াতেই মগ্ন । রোদ্দুর একটু সবার থেকে আলাদা সে ভিড়ের মধ্যেও একটা স্টলে গিয়ে বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে যেন নিজের জগতে ঢুকে যায়। ঠিক তখনই রোদ্দুরের কানের কাছে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, "শুনছেন?"
সে ফিরে তাকাতে দেখলো, মেয়েটার
চুলগুলো খোলা হালকা বাতাসে উড়ছে, আর ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত শান্ত হাসি আর পারফিউম এর স্নিগ্ধ গন্ধ। রোদ্দুর জানে না কেন সে তার চোখ সরাতে পারছিল না।
– আরে এক্সকিউজ মি, শুনতে পাচ্ছো?
– হ্যাঁ বলুন
– এই বইটা তুমি আগে পড়েছ? কেমন?
রোদ্দুর একটু হকচকিয়ে গেল।
— হ্যাঁ মানে ভালো। একটু অন্যরকম, গভীর।
মেয়েটা স্টলের দোকানদারকে বলল
– এই বইটা আমাকে একটা দিন তো!
দোকানদার বলল,
– আসলে দিদি এই বইটা একটাই ছিল যেটা উনি কিনেছেন আর এক্সট্রা কপি নেই সব স্টক আউট হয়ে গেছে।
– যা আমি অনেক দিন ধরে খুঁজছি পেলাম না আর যখন পেলাম তখন স্টক আউট!
তখন রোদ্দুর মেয়েটিকে বলল – আপনি চাইলে বইটা আপনাকে দিতে পারি।
– সত্যি তুমি বইটা দেবে!
– হ্যাঁ দেবো।
– ঠিক আছে তাহলে তুমি বরং আমাকে বইটা আজকে দাও আমি তোমাকে কালকে বইমেলায় ফেরত দিয়ে দেব।
এই বলে মেয়েটি চলে যায়।
এমন সময় রোদ্দুরের বন্ধু কৃশানু এসে বলল, "কিরে প্রেমে পড়লি নাকি?"
রোদ্দুর একটু হেসে উড়িয়ে দিল, "ধুর! এমনিই দেখছি।"
কিন্তু সত্যিটা সে নিজেও জানত না তখন।
কিছুক্ষণ পরে সেই মেয়েটাই আবার এসে বলল,
–ও সরি তোমায় আবার বিরক্ত করলাম, তোমার ফোন নাম্বারটা কি দেওয়া যেতে পারে? কারণ কালকে তাহলে যোগাযোগ করে তোমায় বইটা ফেরত দেবো।
– আচ্ছা ঠিক আছে নোট করো নাম্বার আর তোমার নাম?
– মেঘলা...
তারপর মুচকি হেসে বলল,
– আসছি কাল তাহলে ৬ টার সময় দেখা হবে।
– হ্যাঁ দেখা হবে।
উফ উফ উফ বুকের ভেতর টা কেমন করছে! তখন কৃশানু বুকে হাত রেখে রোদ্দুরকে বলল,
– আজ ঘুম হবে তো রাতে! কারণ রোদ্দুরে যে আজ মেঘলা চলে এলো!
– তুই যে কি বলিস না ভুলভাল! চ বাড়ি যাবি আর বাকি সবাই কে ডাক।
এইভাবেই শুরু।
তারপর থেকে যেন বইমেলাটা অন্যরকম হয়ে গেল। প্রতিদিন তারা দেখা করতে লাগল কখনো বন্ধুদের সাথে, কখনো একটু আলাদা করে। বই নিয়ে কথা, কবিতা পড়া, একে অপরের পছন্দ-অপছন্দ জানা সবকিছুই যেন খুব সহজে হয়ে যাচ্ছিল। মেঘলা গান গাইতে খুব ভালোবাসত। একদিন সন্ধ্যেবেলা, বইমেলার বাইরে একটা ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে সে হালকা গলায় গান ধরল। চারিদিকে ঠান্ডা হাওয়া, আলো-আঁধারির মায়া, আর তার গলায় একটা মিষ্টি বিষণ্ণতা। রোদ্দুর চুপ করে শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটা যেন শেষ না হয়। দিনগুলো কেটে গেল। বইমেলা শেষ হয়ে গেল, কিন্তু তাদের গল্প থামল না।
এখন প্রতি রবিবার রোদ্দুর মেঘলা এবং তাদের বন্ধুরা সবাই মিলে কারও বাড়ির ছাদে জড়ো হয়। খোলা আকাশ, হালকা হাওয়া, আর এক কাপ চা এইগুলোই তাদের সবচেয়ে বড়ো সুখ। মেঘলা প্রায়ই গান গায়। রোদ্দুর চুপ করে শোনে । তার চোখে তখন শুধু মুগ্ধতা, কখনো তারা আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা গোনে।
মেঘলা বলে,
– দেখো, ওইটা আমার তারা।
রোদ্দুর হেসে বলে,
– সব তারাই তো তোমার।
সবকিছুই যেন ঠিকঠাক চলছিল।
কিন্তু একটা জায়গায় এসে রোদ্দুর ভেতরে একটা ঝড় উঠতে লাগল। সে জানে সে অন্যরকম। মেঘলাকে সে খুব ভালোবাসে, খুব কাছের মানুষ মনে হয় কিন্তু সেই ভালোবাসাটা কি প্রেম? নাকি শুধু গভীর একটা টান? কারণ, তার হৃদয়ের অন্য একটা সত্যি আছে রোদ্দুর একটা ছেলেকে ভালোবাসে... বহু বছরের সম্পর্ক... তবে সে সমকামী। অনেকদিন ধরে সে এটা কাউকে বলেনি। বন্ধুরাও না, পরিবারও না। সে নিজেকেও পুরোপুরি স্বীকার করতে পারেনি।
কিন্তু মেঘলার সাথে সময় কাটাতে কাটাতে তার ভেতরের দ্বন্দ্বটা বাড়তে লাগল। একদিন ছাদে সবাই ছিল না। শুধু রোদ্দুর আর মেঘলা। হালকা হাওয়া বইছে। আকাশ ভরা তারা।
মেঘলা হঠাৎ বলল,
— রোদ্দুর একটা কথা বলব?
— হ্যাঁ বলো।
— তুমি জানো তো আমি তোমাকে একটু অন্যরকমভাবে দেখি?
রোদ্দুর এর বুক ধক করে উঠল। সে জানত, এই কথাটা একদিন আসবেই। সে কি করে বলবে, যে সে সমকামী আর সেটা মেঘলা কি চোখে দেখবে।
মেঘলা একটু চুপ করে থেকে বলল,
– আমি তোমাকে ভালোবাসি।
চারিদিক যেন হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রোদ্দুর কিছু বলতে পারছিল না। তার চোখে জল চলে এল।
মেঘলা অবাক হয়ে বলল,
– কি হলো? কিছু বলছ না কেন?
রোদ্দুর ধীরে ধীরে বলল,
– আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি –কিন্তু!
– কিন্তু কী বলো ?
– আমি তোমাকে সেইভাবে ভালোবাসতে পারব না।
মেঘলার চোখে অবিশ্বাস।
— মানে?
রোদ্দুর অনেক কষ্টে বলল,
– আমি সমকামী দীর্ঘদিন ধরে আমার সাথে একটা ছেলের সম্পর্ক আছে অনেক বছর ধরে... ওর নাম স্বতন্ত্র, ও এখন বাইরে গেছে পড়াশোনা করতে।
শব্দটা যেন বাতাসে ঝুলে রইল। মেঘলা চুপ করে রইল। তার চোখে জল জমে উঠল, কিন্তু সে কাঁদল না। কিছুক্ষণ পরে সে খুব ধীরে বলল,
— তাহলে এতদিন?
রোদ্দুর মাথা নিচু করে বলল,
– আমি নিজেও জানতাম না বা মানতে চাইনি। তোমার সাথে থাকলে সবকিছু এত সহজ লাগত আমি ভেবেছিলাম হয়তো বদলে যাবে কিন্ত...
মেঘলা চোখ মুছে একটু হাসল।
– ভালোবাসা কি জোর করে বদলানো যায়?
রোদ্দুর কিছু বলতে পারল না। সেই রাতটা খুব কঠিন ছিল। কিন্তু গল্পটা এখানে শেষ হয়নি।
পরের দিন, মেঘলা আবার রোদ্দুরকে ফোন করল।
– দেখো, আমি তোমাকে হারাতে চাই না। প্রেম না হোক তুমি কি আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে থাকতে পারো?
রোদ্দুর গলায় কান্না।
– পারব।
এরপর থেকে তাদের সম্পর্ক বদলে গেল কিন্তু ভেঙে গেল না। ছাদে এখনো তারা যায়।
মেঘলা এখনো গান গায়। রোদ্দুর এখনো মুগ্ধ হয়ে শোনে। কখনো তারা আবার তারা গোনে। তবে এবার তাদের মধ্যে একটা নতুন বোঝাপড়া আছে, ভালোবাসা সবসময় একই রকম হয় না। কখনো সেটা প্রেম,
কখনো সেটা বন্ধুত্বের থেকেও গভীর কিছু।
বইমেলায় শুরু হওয়া সেই গল্পটা তাই শেষ হয় নি, শুধু রূপ বদলেছে। আর খোলা আকাশের নিচে, তারা দুজনেই জানে সব সত্যি বলার পরেও, যে মানুষটা থেকে যায়,
সেই মানুষটাই সবচেয়ে আপন।
তারপর যখন স্বতন্ত্র একদিন এখানে এলো, সেদিন বিকেলে রোদ্দুর স্বতন্ত্রের সাথে দেখা করতে গেল। পুরনো সেই ক্যাফে, যেখানে তারা প্রথম একসাথে বসেছিল। স্বতন্ত্র চুপচাপ বসে ছিল। রোদ্দুর এসে সামনে বসতেই সে শুধু বলল,
– কিছু বলবি?
রোদ্দুর গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। তবু সে বলল,
– আমি মেঘলা বলে একটা মেয়েকে ভালোবাসি, ওর থেকে দূরে যেতে পারছি না।
স্বতন্ত্র কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। তার চোখে কষ্ট ছিল, কিন্তু রাগ ছিল না।
– তাহলে আমার থেকে দূরে যাচ্ছিস?
রোদ্দুর মাথা নিচু করে বলল,
– আমি নিজেও বুঝতে পারছি না আমি কি করবো আর কি না করব কিন্তু মেঘলার প্রতি আমার যে অনুভূতি তৈরি হয়েছে সেটা আর ভুলে যাওয়ার নয় ।
স্বতন্ত্র হালকা হেসে বলল,
– তুই সুখে থাকলেই হলো আমি সেটা চাই।
এই কথাটা শুনে রোদ্দুরের বুকটা যেন ভেঙে গেল। সে জানত স্বতন্ত্রকে সে হারাচ্ছে। কিন্তু তবুও সে উঠে দাঁড়াল। সেদিন তাদের গল্পটা শেষ হয়েও হলো না।
এরপর রোদ্দুর ধীরে ধীরে মেঘলার কাছে ফিরে এল। প্রথমে বন্ধুর মতো তারপর একটু একটু করে আবার কাছে আসা। মেঘলা প্রথমে দূরে ছিল। সে ভয় পাচ্ছিল, আবার যদি ভেঙে যায়? কিন্তু রোদ্দুর এবার আর কিছু লুকালো না। সে নিজের সত্যিটা স্বীকার করল, নিজের দুর্বলতাও। একদিন ছাদে দাঁড়িয়ে রোদ্দুর বলল,
– আমি পুরোপুরি স্ট্রেট না, কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি। এই ভালোবাসাটা আমি আর অস্বীকার করতে পারছি না।
মেঘলা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
– ভালোবাসা সবসময় একরকম হয় না কিন্তু তুমি যদি সত্যি থাকো, আমি থাকব।
সেই রাতটা আবার তারা গুনে কাটল কিন্তু এবার কোনো লুকোনো কথা ছিল না।সময় কেটে গেল।
বছর পেরিয়ে গেল।
বন্ধুদের আড্ডা, ছাদের হাওয়া, গান সবকিছু একটু একটু করে বদলালো, বড়ো হলো।
রোদ্দুর আর মেঘলা একসাথে রইল একটা অন্যরকম সম্পর্কে। যেখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু তার সংজ্ঞাটা একটু আলাদা। প্রায় অনেক বছর পরে আবার বইমেলা। সবকিছু আগের মতোই ভিড়, বইয়ের গন্ধ, সেই পুরনো উত্তেজনা। কিন্তু রোদ্দুরের মেঘলার মধ্যে একটা নামহীন সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। রোদ্দুর একা হাঁটছিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল একটা পরিচিত মুখ।
– স্বতন্ত্র!
সময় যেন হঠাৎ থেমে গেল।
স্বতন্ত্র তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার চোখে আর সেই আগের কষ্ট নেই, শুধু এক ধরনের শান্তি। দুজন ধীরে ধীরে একে অপরের দিকে এগিয়ে এল।
– কেমন আছিস?
স্বতন্ত্র জিজ্ঞেস করল।
– ভালো, তুই?
– আমি-ও ভালো।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর স্বতন্ত্র হেসে বলল,
– তুই তবে ঠিকটাই বেছে নিয়েছিলি।
রোদ্দুর একটু অবাক, মানে?
— যার সাথে তুই শান্তি পাস, তোর নিরাপদ জায়গা। সারাদিনের ক্লান্তির যার কাছে তুই থাকতে পারিস । মেঘলা তোর জীবনে আসার আগেই আমি তোকে সময় দিতেই পারিনি, তোকে বুঝতে পারিনি, তোর খেয়াল রাখতে পারিনি আমি পারিনি তোকে আমার কাছে রাখতে। আর তুই ঠিক করেছিস মেঘলাকে বেছে।
রোদ্দুর চোখ ভিজে উঠল।
– তোকে ভুলিনি কোনোদিন...
সে ধীরে বলল।
স্বতন্ত্র মাথা নাড়ল,
– আমিও না, কিন্তু সব গল্প একসাথে শেষ হয় না।
দূরে মেঘলার গলা শোনা গেল, সে বন্ধুদের সাথে দাঁড়িয়ে গান গাইছে। রোদ্দুর পিছন ফিরে তাকাল। স্বতন্ত্র বলল,
– যা তোর জায়গা ওখানে।
রোদ্দুর একবার শেষবারের মতো স্বতন্ত্র দিকে তাকাল। তারপর মেঘলার দিকে হাঁটতে লাগল। মেঘলা গান থামিয়ে বলল,
– কোথায় ছিলে?
রোদ্দুর বলল,
– একটা পুরনো গল্পের সাথে দেখা হয়ে গেছিল।
– শেষ হলো?
রোদ্দুর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
– না কিছু গল্প শেষ হয় না শুধু জায়গা বদলায়।
মেঘলা তার পাশে এসে দাঁড়াল। আকাশে আবার তারা জ্বলছে। রোদ্দুর এবার আর গুনছে না সে শুধু তাকিয়ে আছে। কারণ, এবার সে জানে সে কাকে বেছে নিয়েছে। আর সেই বেছে নেওয়াটার মধ্যেই
তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো সত্যিটা লুকিয়ে আছে।
কলমে - #অলিগলি_স্নেহা
ছবি সংগৃহীত