27/09/2025
স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা চূয়াড় বিদ্রোহ (1767-1833) সূচনাকারী বীর শহীদ জগন্নাথ সিং এর জন্মজয়ন্তী তে জানাই শতকোটি জঁহার, বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী ও গড় জঁহার।।
আপনারা পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম জেলার বেলপাহাড়ী থানার অন্তর্গত কাঁকড়াঝোর ও আমলাশোলের নাম নিশ্চই শুনেছেন। যেখানে মানুষের অনাহারে প্রান গেছে বা এখনও পিঁপড়ের ডিম খেয়ে আদিবাসী মানুষেরা জীবণ জাপন করছে। বিশেষত ওখানকার শব্বরদের খাদ্য সহ জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন পিঁপড়ের ডিম ।
সেই কাঁকড়াঝোর ও আমলাশোল গ্রামের ঢিলছোড়া দূরত্ব দামপাড়ার মালিগড়ে ২৭ সেপ্টেম্বর ১৭৪৪ সালে জন্ম গ্রহন করেন বীর জগন্নাথ সিং । তবে বীর জগন্নাথ সিং ওনার পদবি "পাতর" লিখতেন পরে ওনার পুত্র বীর শহীদ বৈদ্যনাথ সিং-এর অমলে "পাতর" থেকে "সিং" পদবি গ্রহন করেন।
ধলভূম পরগনার ঘাটশিলার দামপাড়া, মালিগড় পূর্ব বেঙ্গলের মেদিনীপুর জেলার অন্তর্গত ছিল বর্তমানে ঝাড়খন্ড রাজ্যের অন্তর্গত। তিনি ছিলেন ৬০ মৌজার মাল্লিক তথা জমিদার ও রাজা। প্রজা সৈন্যদের শক্তি সঞ্চয় ও যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ছিল বিশেষ বিশেষ আখড়া। যেমন ছিল কুস্তি আখড়া, ডাল তরোয়াল ও লাঠি চালানো প্রশিক্ষণের আখড়া, ধনুকের মাধ্যমে তীর নিক্ষেপ প্রশিক্ষণের জন্য ছিল বিশেষ জায়গা। ধলভূম পরগনার বীর জগন্নাথ সিং ছিলেন সাহসী এবং সৎ পরায়ণ স্বাধীন রাজা।
১৭৬৫ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভ করে এবং রাজস্ব কর ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করে দেয়। ফলে রাজা জমিদারদের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই রাজস্ব কর। রাজা জমিদাররা ক্ষোভে ফেটে পড়েন ও রাজস্ব কর দিতেও অস্বীকার করে।
দেওয়ানি লাভের দু বছরের মাথায় রাজস্ব করের বিরুদ্ধে ১৭৬৭ সালে প্রথম জগন্নাথ সিং ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষনা করেন (ড.জি.কে পাহাড়ী এবং ড.সুভাষ বিশ্বাসের লেখা " ইতিহাস ও পরিবেশ" P45 //Jagdish Chandra Jha " THE BHUMIJ REVOLT 1832-33" ) । বিদ্রোহে ইংরেজরা পরাজিত হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। বিদ্রোহের আগুন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
বরাভূম পরগনার কুইলাপালের রাজা সুবলা সিং এই বিদ্রোহকে সমর্থন জানিয়ে জগন্নাথের সাথ দেয় এবং নিজেও ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন। ধাদিকার জমিদার শ্যামগুঞ্জন সিং সুবলা সিং -কে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে যুদ্ধে সহযোগিতা করেন। ইংরেজরা অবস্থা উপলব্ধি করতে পেরে আরো ইংরেজ সৈন্য তাঁদের ঘাটিগুলিতে মোতায়ন করেন। ১৭৬৮ থেকে খন্ড যুদ্ধ চলতে চলতে ১৭৬৯ এর শেষের দিকে বিদ্রোহ সংগঠিত হয় ।
কুইলাপালের জমিদার সুবলা সিং-কে ইংরেজরা ৮ জানুয়ারি ১৭৭০ তে ফাঁসি দেয় ( Jagdish Chandra Jha " THE BHUMIJ REVOLT 1832-33" P8)। পরে ১৭৭০ সালের ৫ই এপ্রিল বীর জগন্নাথ সিং সহ শ্যামগুঞ্জন সিং কেও ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে। তবে বিদ্রোহ তাতেও থেমে যায়নি চারিদিকে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল।
আজও সেই রাজ প্রসাদের ধ্বংসাবশেষ প্রায় বিলীয়মান । বাবা ভৈরব থান সহ মারাং বুরুর থান যদিও রয়েছে তা ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের দখলে। বংশধরেরা আজও রয়েছে তবে বর্তমানে তাঁরা ঝাড়খণ্ডের লাকাইশিনী পাহাড়ের কোলে ঝাটিঝর্ণা গ্রামে বসবাস করছে। তাঁরাই পূজা সেবা করে বলে সেখানে তারা " লায়া (নায়া) " পরিবার বলে পরিচিত। গ্রামবাসীরাই নিজেদের উদ্যোগে সেখানে বীর শহীদ রঘুনাথ সিং-এর পূর্ণ অবয়ব মূর্তি স্থাপন করেছেন।
ব্রিটিশবিরোধী লাগাতার তিন পুরুষ ( জগন্নাথ সিং, পুত্র- বৈদ্যনাথ সিং, বৈদ্যনাথ পুত্র - বীর শহীদ রঘুনাথ সিং) - এর স্বাধীনতা সংগ্রামী ইতিহাস জড়িত সেই দামপাড়ার মালিগড় জায়গা সহ তিন পুরুষের জীবন গাঁথা ইতিহাস আজও অনেকের কাছেই অজানা।
সরকারী উদ্যোগে কাঁকড়াঝোর টুরিস্টের জায়গা হিসাবে গড়ে উঠলেও সেই সমস্ত বীরদের কোনো পরিচয়ই সেখানে পাওয়া যায় না!
আদিবাসী পিছিয়ে পড়া ভূমিজ জাতি সম্প্রদায়ের ইতিহাস বলেই হয়তো ঝাড়খণ্ড সরকার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকার কেউ গুরুত্ব দেয়নি!
যাই হোক বীর শহীদ জগন্নাথ সিং থাকবে আমাদের হৃদয় মাঝারে অমর হয়ে। আমরা তাঁর আত্মবলিদান ভুলছি না, ভুলবো না।।
বীর শহীদ জগন্নাথ সিং জিৎকার