28/07/2026
শুক্রবার কলকাতায় মিডিয়ার উপর হামলা হয়েছিল। আমার অবস্থান আগেই স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছি। সোমবার তার প্রতিবাদে কিছু সাংবাদিক মিছিল করলেন। সাংবাদিকদের নির্বাচিত সংগঠন কলকাতা প্রেস ক্লাব আগেই প্রতিবাদ সভা করেছে। তারপর আজ কিছু সাংবাদিকের মিছিল।
তাহলে দেখা যাচ্ছে আজকের মিছিলটা মিডিয়া কোম্পানিগুলোর নির্দেশে নয়, সাংবাদিকদের নির্বাচিত সংস্থার ডাকে নয়, সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগে নিজের ইচ্ছায় মিছিল। স্বাধীন মিছিল।
মিডিয়ার উপর আক্রমণে জড়িতদের শাস্তির দাবির পাশাপাশি আজকের 'স্বাধীন' মিছিলে বলা যেত, কোনও নিরপরাধকে মুসলিমকে গ্রেফতার করা যাবে না। সেরকম কাউকে গ্রেফতার করা হলে তাদের ছেড়ে দিতে হবে। বলা হয়েছে?
দাবি করা যেত, মুখ্যমন্ত্রী যে শুক্রবারের লোকেরা হামলা করেছে বলে মন্তব্য করেছেন, সেটা প্রত্যাহার করতে হবে। কয়েকটা দুষ্কৃতীর জন্য সামগ্রিক ভাবে মুসলিমদের অপমান করা যাবে না।
কে দাবি করবে? একটি চ্যানেলের মুখই তো ব্যক্তিগত ভাবে শুক্রবারিয়া বলে লিখছেন। লিখছেন বিদেশের টাকায় দিল্লির অন্দোলন। আর বিদেশ মন্ত্রক বলছে বিদেশি টাকার কথা তাদের জানা নেই। ওই মিডিয়ার মুখকে তো মিথ্যা ছড়ানোয় গ্রেফতার করা উচিত। সিপিএম পন্থী এক তরুণ মিডিয়াকর্মী তাঁর মুসলিম সহকর্মীদের সামনে চিৎকার করে বলছে, মুসলমানরাই আমাদের মেরেছে। ১০০ জনের মধ্যে ৯৮ জনই মুসলমান। এই কথাটা যাতে আরও অনেকে বলে সেজন্যই কি মিছিলের ডাক?
আজকের স্বাধীন মিছিল থেকে বলা যেত, হামলার পরিকল্পনা যারা করেছে তাদের শাস্তি চাই। আচ্ছা বলুন তো, কলকাতার বিভিন্ন প্রান্ত কিছু মুসলিম এলো, মোদীর ছবিতে লাথি মারল, পুলিসকে বোতল জুতো লাঠি ছুড়লো। তারপর চলে গেল। কিসের মিছিল, কেন মিছিল কেউ জানে না। ওরা সবাই মিলে একই কাজ করল! পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব? কে পরিকল্পনা করল? আমি সামান্য একজন মিডিয়াকর্মী। আমি জানি। আগে লিখেওছি। যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ নেই বলে সরাসরি বলতে পারছি না। কিন্তু দাপুটে মিডিয়া তারকারা তো জানবেন। বলুন না কারা পরিকল্পনা করেছিল। নয়তো সরকারকে প্রশ্ন করুন। চ্যানেলে বা কাগজে প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। স্বাধীন মিছিলে তো সেই সুযোগ ছিল। করলেন না কেন? সিস্টেমকে প্রশ্ন করাটাই তো সাংবাদিকের প্রাথমিক কাজ। পুলিশের সামনেই হয়েছে। পুলিশ কেন ঘটনাস্থলেই গ্রেফতার করেনি? তাহলে মুখ্যমন্ত্রী হুঙ্কার ছাড়তে পারবেন না বলে?
যে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে মিছিলের ডাক ওইসব প্রশ্ন তুললে সেটাই কি পণ্ড হয়ে যেত? বজরং দলের বদলে সেজন্যই কি কলকাতার নানা প্রান্ত থেকে কিছু মুসলিমকে জড়ো করা হয়েছিল?
***
মিডিয়ার কম বয়সী কিছু কর্মী মাঝে মাঝে বলেন, দাদা এরকম মানুষের বিরুদ্ধে বলে যেতে লজ্জা লাগে।
আমি বলি, ব্যক্তিগত ভাবে লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। কোম্পানি যা চাইবে তাই করতে হবে। মিডিয়া কোনও কালেই নিরপেক্ষ নয়। মিডিয়া মোটেই গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ নয়। গণতন্ত্রের তিনটিই স্তম্ভ। মিডিয়া চলে মালিকের টাকায়। মালিকের ব্যবসার যাতে ভালো সেটাই হবে।
বরুণ সেনগুপ্ত, জ্যোতির্ময় দত্ত, গৌরকিশোর ঘোষের মত সাংবাদিক জরুরি অবস্থার সময় গ্রেফতার হয়েছিলেন নিজস্ব অবস্থানের কারণে। আবার সেই বরুণ সেনগুপ্তই নিজের কাগজে মমতা ব্যানার্জিকে অগ্নিকন্যা বানিয়েছিলেন ব্যবসার জন্য।
সম্পদ যত কুক্ষিগত হবে ততই মিডিয়া, বিচারবিভাগ সহ সব প্রতিষ্ঠানের হাত পা বাঁধা হয়ে যাবে। তাই গণতন্ত্র সূচকে ভারত এখন চিহ্নিত নির্বাচিত স্বৈরাচার ক্যাটাগরিতে, সূচকে নামতে নামতে এখন ১০০ নম্বরে আর প্রেস সূচকে ১৫৭। তবে প্রতিষ্ঠানগত ভাবে যুক্তি সত্য বলার সুযোগ না থাকলেও নিজের ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে নিজের কথা বলে যা। সাংবাদিকের কাজ প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করা। এই কথাগুলোই আমি বলি কম বয়সী বন্ধুদের।
চিরকালই হয়েছে, বাজার অর্থনীতির যুগে আরও বেশি হচ্ছে, কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকের আখের গোছানো। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখবেন, মিডিয়ার এক মহাতারকা মমতার হয়ে গলা ফাটাতেন। এখন বিজেপির হয়ে বলছেন। এরকম অনেক পাবেন। এর পিছনে থাকে ব্যক্তিগত হিসেব নিকেশ। একদল মিডিয়া তারকা নির্লজ্জ, মিথ্যা, বিদ্বেষ ছড়ান নিজেদের ব্যক্তিগত পোস্টে। সেটার সঙ্গে তিনি যেখানে চাকরি করেন তার পলিসির কোনও সম্পর্ক নেই। এটা করেন নিজস্ব আখের গোছাতে। কে কত সরকারের গায়ে গা ঘেঁষে চলবেন, কলাটা মূলোটা পাবেন সেই টক্কর চলে। অথচ সাংবাদিকের প্রাথমিক কাজ, প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করা। ব্যবসায়িক কারণে নিজের চ্যানেল বা কাগজে না হয় করা যায় না, কিন্তু ব্যক্তিগত স্তরে তো করা যায়।
গত ১২ বছরে মিডিয়ার হাত পা শুধু আরও শক্ত করে বেঁধে ফেলা হয়েছে তাই না, অন্তত ২৮ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন, তাঁদের বেশিরভাগই পরিবেশ সংক্রান্ত খবর করতে গিয়ে খুন হয়েছেন।
***
মিডিয়াকর্মীরা সমাজের সন্তান। সমাজের প্রতি দায় আছে তাঁদের। আমি ২৫ বছরের মিডিয়া জীবনে একবারই মিডিয়াকর্মীদের মিছিলে হেঁটেছি। নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলি চালানোর বিরুদ্ধে প্রেস ক্লাবের ডাকে মিছিলে।
জানি না, এরকম সামাজিক দাবিতে মিডিয়াকর্মীদের মিছিল আর হবে কিনা। প্রেস ক্লাবে নির্বাচন হয়। গত জমানায় কারা মাথা হবেন সেটা ঠিক করে দিতেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন সাংবাদিককে অন্য নানা প্রশাসনিক পদেও বসানো হয়েছে। হালচাল দেখে মনে হচ্ছে সেই ধারা এই জমনাতেও চলবে। তার জন্যই চলছে তীব্র দৌড়।
সাংবাদিক Uttal Ghosh এর wall থেকে নেওয়া।🙏