21/08/2026
দার্জিলিং ভ্রমণ — দ্বিতীয় পর্ব
ট্রেন তার নির্দিষ্ট সময়েই যাত্রা শুরু করল। সময়সূচি অনুযায়ী, আমাদের এই দীর্ঘ যাত্রার শেষে রাত সাড়ে আটটা নাগাদ এনজেপি পৌঁছানোর কথা। সামনে লম্বা পথ—আর সেই পথকে আরও আনন্দময় করে তুলতে শুরু হয়ে গেল আমাদের আড্ডা, গল্প আর হাসি-ঠাট্টা।
দৈনন্দিন জীবনে সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত থাকি। একসঙ্গে এতটা সময়, কোনো তাড়া ছাড়াই, ফাঁকা মনে বসে গল্প করার সুযোগ কোথায়! তাই ট্রেনের এই দীর্ঘ যাত্রাটুকু যেন আমাদের কাছে এক অন্যরকম পাওয়া। সেই সময়টুকুরই সদ্ব্যবহার শুরু হয়ে গেল।
আমরা সেকেন্ড সিটিং নিয়েছিলাম। আশ্চর্যের বিষয়, আমাদের কামরাটি বেশ ফাঁকাই ছিল। যাত্রীও ছিল তুলনামূলকভাবে খুব কম। উত্তরবঙ্গগামী অন্যান্য ট্রেন, বিশেষ করে হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে রাতের বেলা ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোর টিকিট যেখানে এক মাস, দেড় মাস আগেও পাওয়া কঠিন, সেখানে এই ট্রেনের টিকিট এক সপ্তাহ আগেও পাওয়া গেল। সম্ভবত দিনের বেলা যাত্রা হওয়াটাই এর কারণ। যারা দার্জিলিং বা উত্তরবঙ্গ বেড়াতে যান, তাঁদের অনেকের কাছেই দিনের একটা বড় অংশ ট্রেনে কাটানো মানে যেন একটি দিন নষ্ট হয়ে যাওয়া। তাই হয়তো এই ট্রেনে ভিড়ও তুলনামূলক কম।
যাই হোক, ক্যাপ্টেন আগেই বলে দিয়েছিল—দুপুরের সময়টা ট্রেনেই কাটবে, তাই প্রত্যেকে যেন বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসে। কথামতো সবাই নিজের নিজের বাড়ি থেকে টিফিন বক্সে করে খাবার নিয়ে এসেছিল। দুপুর গড়াতেই সেই খাবারেরও সদ্ব্যবহার শুরু হলো। খাওয়া-দাওয়ার সঙ্গে চলছিল দীর্ঘ, একটু আলসেমি জড়ানো আড্ডা।
ট্রেন মালদা টাউনে ঢোকার আগেই আমরা দুপুরের আহার সেরে নিলাম। এরপর ট্রেন এসে দাঁড়াল মালদা টাউন স্টেশনে। এখানে বেশ কিছুক্ষণ ট্রেন দাঁড়িয়ে রইল। মালদা মানেই আম—আর সেই পরিচয়ের যেন বাস্তব প্রমাণ মিলল স্টেশনেই।
কয়েকজন বিক্রেতা ক্যারিব্যাগ হাতে নিয়ে হাঁক দিচ্ছিলেন—“আম নেবেন? আম নেবেন?” একেকটি প্যাকেটে আনুমানিক দেড় থেকে দুই কেজি আম। দাম চাইছিলেন মাত্র ৫০ টাকা! বর্তমান বাজারদরের তুলনায় নিঃসন্দেহে বেশ কম। আম দেখে ইচ্ছে তো হচ্ছিল, কিন্তু তখন আমাদের অভিমুখ অন্যদিকে। তাই ইচ্ছেটাকে আপাতত ইচ্ছেই থাকতে হলো। মনে হলো, ফেরার সময় যদি সুযোগ হয়, তখন দেখা যাবে।
এদিকে দুপুরের টিফিন শেষ করে দলের সঙ্গীরা যে যার মতো সিটে বসে ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন এটাকে ঘুম বলব, না তন্দ্রা—সেটা আপনারাই বিচার করুন! ট্রেন ছুটে চলেছে, পথ এখনও অনেক বাকি।
এদিকে ট্রেন তার নিজস্ব গতিতে ছুটে চলেছে, আর সময়ও তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলেছে। বিকেল প্রায় শেষের দিকে। পশ্চিম আকাশে অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। আধো আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রকৃতি।
এরই মধ্যে আমাদের ট্রেন অল্প সময়ের মধ্যেই বিহারের কিষানগঞ্জ পেরিয়ে এনজেপির দিকে ছুটে চলেছে। একটা সময় চোখে পড়ল এক চমৎকার দৃশ্য—রেললাইন আর সড়কপথ যেন পাশাপাশি ছুটে চলেছে। রেলপথে আমাদের ট্রেন, আর পাশের সড়কপথে উত্তরবঙ্গগামী বাস, ট্রাক ও প্রাইভেট গাড়ি—সবাই যেন নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে।
ট্রেন পথে একটু দেরি করেছিল ঠিকই, কিন্তু শেষ সময়ে গতি বাড়িয়ে যেন সেই দেরির ঘাটতি পুষিয়ে দিল। আমরাও ধীরে ধীরে আমাদের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চললাম।
অবশেষে ঘড়ির কাঁটা যখন রাত সাড়ে আটটার কাছাকাছি, তখন আমাদের ট্রেন এসে পৌঁছাল নিউ জলপাইগুড়ি—এনজেপি স্টেশনে।
দীর্ঘ ট্রেনযাত্রার সমাপ্তি হলো। সামনে অপেক্ষা করছে পাহাড়, মেঘ, ঠান্ডা হাওয়া আর দার্জিলিংয়ের নতুন এক গল্প।(চলবে)