12/08/2026
হয়তো কোনোদিন কোনো শ্মশানে, কোনো বিয়েবাড়িতে, কিংবা নিছক কোনো গেট টুগেদারে এক বছর, তিন বছর বা আরও অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর আবার দেখা হবে আমাদের।
যুবরাজ কাঁধে ব্যাগ নিয়ে আসবে। যেন এখান থেকে আবার কোথাও চলে যাওয়ার তাড়া আছে ওর। ঋষিরাজ নেমেই একগাল হাসি হেসে বলবে, কিরে দাদা, পুরো তাপস পাল হয়ে গেলি তো।দিব্য তার ছেলেকে দেখিয়ে বলবে, এটা তোমার এক জেঠু হয়। তারপর একটু কাছে এসে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করবে, কেমন কাজ চলছে দাদা? বিন্দাস?
দিদি আসবে। আগের মতোই সবার খবর নেবে। আমাকে দেখেই বলবে, একটু হাঁট সকালে, বড্ড মোটা হয়ে যাচ্ছিস। ঝুকাই, মানাই এসে একরাশ ঝলমলে হাসি নিয়ে জিজ্ঞেস করবে, কেমন আছো?পৃথ্বীরাজ আসবে। ওর হাঁটা, ওর কথা বলার ভঙ্গির মধ্যে কাবুলমামার কি আশ্চর্য মিল। মৌঝুরি একটু দূরে আমার বউয়ের সঙ্গে কথা বলছে, আমার বউ মন দিয়ে শুনছে ওর কথা।
আমি হয়তো একটু দূরে দাঁড়িয়ে শুধু দেখব।
দেখব, একটা প্রজন্ম একসাথে হয়েছে।যে যার নিজস্ব কুঠুরি থেকে বেরিয়ে। জীবন তাদের আলাদা আলাদা ঠিকানায় ছড়িয়ে দিয়েছে, অথচ জন্মের শিকড়টা আজও একই জায়গায় বাঁধা। সময় কিছু অদৃশ্য সুতো বোধহয় কখনও ছিঁড়তে পারে না।
আর ঠিক তখনই আমার ভিতরে শুরু হবে একটা back and play মোডে বহু পুরোনো, অথচ কি আশ্চর্য রকমের তরতাজা স্মৃতির মনতাজ। মনের হলে যেন গতকালেরই কোনো ফ্ল্যাশব্যাক চলছে।
ট্যাক্সিভর্তি খাবার নিয়ে মা চলেছেন ভাইফোঁটা দিতে। টেবিলে বসে অনবরত সিগারেট খাচ্ছে বাপি মামা। নমামা কী একটা বলতেই ঘরজুড়ে হাসির রোল উঠল। মানাই আমাকে ডেকে নিয়ে গেল নিচে, ওদের সেই একচিলতে ঘরে। ছোট্ট ঘরটা আলো করে বসে আছে মেজো মাইমা। আর দিদিমা ফোঁটা দিয়ে আশীর্বাদ করলেন, হাতে দিলেন দশটা টাকা, সঙ্গে দুটো মনোহরা।
তখন বুঝিনি, এই ভালোবাসার ওই দশ টাকাটার মূল্য কতখানি।
আসলে স্মৃতিরও বোধহয় নিজস্ব একটা ভূগোল থাকে। কিছু বাড়ি, কিছু ঘর, কিছু সিঁড়ি, কিছু মুখ, কিছু হাসির শব্দ সময়ের সঙ্গে তারা আর ঠিকানা থাকে না, হয়ে ওঠে আমাদের অস্তিত্বের অংশ বুকের পাঁজর।
তাই আজও আমার কাছে ৪০ নম্বর রামধন মিত্র লেন শুধুই একটা বাড়ির নম্বর নয়।
৪০ নম্বর আমার জীবনের বোধের নম্বর।
যে নম্বর দিয়ে আজও নিজের শিকড়কে খুঁজে বেড়াই । যে ঠিকানায় ফিরে গেলে হয়তো আর সেই মানুষগুলোকে পাব না, সেই দাদুর ঘরটাও আগের মতো আর হয়তো নেই।তবু কোথাও মনেমনে দিদিমা আজও ফোঁটা দিয়ে আশীর্বাদ করছেন, হাতে দশটা টাকা তুলে দিচ্ছে।
আর আমি আজও ফিরে পেতে চাই সেই ৪০ নম্বর।
ফিরে পেতে চাই আমার জীবনের সেই বোধের নম্বর।
আর একবার শুধু আর একবার খেতে চাই দিদিমার দেওয়া সেই মনোহরা।