04/08/2026
আজ আমরা মোবাইল ফোনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি কোম্পানির শেয়ার কিনে ফেলি, বিক্রি করি বা অপশনে ব্যবসা করি। কিন্তু ভারতবর্ষের শেয়ারবাজারের শুরুর দিনগুলো তো সেরকম ছিল না! তাহলে আসুন জেনে নেওয়া যাক ভারতবর্ষের শেয়ারবাজারের সেই দিনগুলোর কথা এবং কীভাবে এর বিবর্তন ঘটেছে।
তবে সবার আগে এটা জেনে নেওয়া ভালো, শেয়ার আসলে কী?
সহজ ভাষায় বললে, একটি কোম্পানির মালিকানার ছোট্ট একটি অংশের নামই শেয়ার। ধরুন, একটি কোম্পানি ব্যবসা আরও বড় করতে চায়। তার জন্য প্রয়োজন মূলধন। তখন তারা কোম্পানির মালিকানাকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করে। সেই অংশগুলোরই নাম শেয়ার। আপনি যদি সেই শেয়ারের কিছু অংশ কিনে নেন, তাহলে আপনিও সেই কোম্পানির একজন ক্ষুদ্র মালিক হয়ে যান। কোম্পানি লাভ করলে আপনার শেয়ারের মূল্য বাড়তে পারে, আবার লোকসান হলে তার দাম কমতেও পারে। এই শেয়ার কেনাবেচার সংগঠিত ব্যবস্থার নামই শেয়ারবাজার বা স্টক মার্কেট।
এবার চলুন, সময়ের কাঁটা ঘুরিয়ে নিয়ে যাই প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি আগের সময়ে।
১৮৫০-এর দশক থেকে ১৮৭৫ সাল। মুম্বইয়ের টাউন হলের সামনে একটি বড় বটগাছের নীচেই চলত ভারতের প্রথম দিকের শেয়ার কেনাবেচা। তখন স্বাভাবিকভাবেই কোনো স্টক এক্সচেঞ্জ ছিল না, ছিল না কম্পিউটার, ইন্টারনেট বা মোবাইল অ্যাপ। কয়েকজন দালাল ও ব্যবসায়ী মুখোমুখি বসে দর ঠিক করতেন, কাগজে লেনদেন লিখতেন, আর শেয়ারের মালিকানা বদলাত কাগজের লেখালেখির মাধ্যমে। অনেক সময় একটি লেনদেন সম্পূর্ণ হতে কয়েক দিন, এমনকি কয়েক সপ্তাহও লেগে যেত। বিশ্বাস, মুখের কথা এবং লিখিত নথির ওপরই দাঁড়িয়ে ছিল সেই সময়ের কেনাবেচা।
প্রথম দিকে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার নিয়েই লেনদেন শুরু হয়েছিল। এই লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্রোকাররা ১৮৭৫ সালে একটি সংগঠন তৈরি করেন, যার নাম ছিল Native Share & Stock Brokers' Association। পরবর্তীকালে সেটিই Bombay Stock Exchange (BSE) নামে পরিচিত হয়—এশিয়ার প্রথম স্টক এক্সচেঞ্জ। এরপর ধীরে ধীরে আরও বেশি কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে শুরু করে। বিনিয়োগকারীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ আমলের শিল্প-বাণিজ্য থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পর ভারতের শিল্পায়নের প্রতিটি ধাপেই শেয়ারবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কলকাতা, আহমেদাবাদ, মাদ্রাজ-সহ দেশের আরও কয়েকটি শহরেও স্টক এক্সচেঞ্জ গড়ে ওঠে।
কিন্তু শেয়ারবাজারের ইতিহাসে শুধু সাফল্যের গল্পই নেই। আছে কিছু তিক্ত অধ্যায়ও, যেগুলো শেষ পর্যন্ত ভারতের পুঁজিবাজারকে আরও শক্তিশালী করেছে।
১৯৯২ সালে এই বাজারেই হর্ষদ মেহতা কেলেঙ্কারি গোটা দেশকে স্তম্ভিত করে দেয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থার কিছু ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বিপুল অর্থ শেয়ারবাজারে এনে কয়েকটি নির্দিষ্ট শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়। দাম বাড়তে দেখে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও সেই শেয়ার কিনতে শুরু করেন। পরে কারসাজি প্রকাশ্যে আসতেই বাজারে বড় ধস নামে এবং হাজার হাজার মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েন।
এই ঘটনার পর ভারতের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের সংস্কার শুরু হয়। ১৯৮৮ সালে গঠিত SEBI-কে ১৯৯২ সালের SEBI Act-এর মাধ্যমে পূর্ণ আইনগত ক্ষমতা দেওয়া হয়। ব্রোকারদের নথিভুক্তকরণ বাধ্যতামূলক করা হয়, শেয়ারের দাম নিয়ে কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর আইন আনা হয়, তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির তথ্য প্রকাশের নিয়ম আরও কঠোর করা হয় এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় SEBI-কে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়।
এই সংস্কারের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে National Stock Exchange (NSE) এর আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং পূর্ণাঙ্গ স্ক্রিন-ভিত্তিক ইলেকট্রনিক ট্রেডিং চালু হয়। একই বছর BSE-ও BOLT (BSE On-Line Trading) ব্যবস্থা চালু করে। এর ফলে ভারতের শেয়ারবাজারে কম্পিউটারভিত্তিক ট্রেডিংয়ের যুগ শুরু হয়। দেশের যে কোনো প্রান্তের বিনিয়োগকারী একই সময়ে, একই দামে এবং তুলনামূলকভাবে আরও স্বচ্ছভাবে লেনদেনের সুযোগ পেতে থাকেন।
১৯৯৬ সালে ডিম্যাট ব্যবস্থা চালু হওয়ায় কাগজের শেয়ারের পরিবর্তে ইলেকট্রনিকভাবে শেয়ার সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের যুগ শুরু হয়। জাল শেয়ার সার্টিফিকেট, হারিয়ে যাওয়া কাগজ কিংবা মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা অনেকটাই দূর হয়ে যায়।
এরপর ২০০০ সালের দিকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনলাইন শেয়ার কেনাবেচার সুযোগ চালু হয়। যদিও তখনও এটি মূলত প্রযুক্তি-সচেতন এবং তুলনামূলকভাবে সীমিত সংখ্যক বিনিয়োগকারীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
তবুও অনিয়মের চেষ্টা থেমে থাকেনি। ২০০১ সালে কেতন পারেখ কেলেঙ্কারি আবারও বাজারকে নাড়া দেয়। কিছু প্রযুক্তি ও মিডিয়া সংস্থার শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার পর SEBI ও স্টক এক্সচেঞ্জগুলি নজরদারি আরও কঠোর করে। ফলে বাজারে কারসাজি করা আগের তুলনায় অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
পরবর্তী দুই দশকে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ভারতের শেয়ারবাজারেও আমূল পরিবর্তন আসে। ব্রডব্যান্ড, 4G ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনের প্রসার বিনিয়োগকে আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ করে তোলে। ২০০৯–২০১০ সাল থেকে ডিসকাউন্ট ব্রোকারদের আগমনে ভারতের শেয়ারবাজারে আর একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। কম ব্রোকারেজ, সহজ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং মোবাইল অ্যাপের সুবিধার কারণে লক্ষ লক্ষ নতুন বিনিয়োগকারী প্রথমবারের মতো শেয়ারবাজারে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন।
২০২০ সালের কোভিড-পরবর্তী সময়ে ভারতের শেয়ারবাজারে এক নতুন বিপ্লব ঘটে। ঘরে বসে কাজ, ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার এবং সহজ অনলাইন অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা কোটি কোটি নতুন বিনিয়োগকারীকে প্রথমবারের মতো শেয়ারবাজারে নিয়ে আসে। যে বাজার একসময় মূলত বড় শহরের ধনী বা পেশাদার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা আজ ছোট শহর, মফস্বল এমনকি গ্রামের মানুষের কাছেও পৌঁছে গেছে।
এই আধুনিকীকরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল ২০২২–২৩ সালে ধাপে ধাপে T+1 Settlement চালু হওয়া। বর্তমানে ভারতের ইকুইটি বাজারে T+1 Settlement-ই সাধারণ নিয়ম। ফলে অধিকাংশ শেয়ার লেনদেনের নিষ্পত্তি মাত্র এক কর্মদিবসের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। বিশ্বের দ্রুততম সেটেলমেন্ট ব্যবস্থাগুলির অন্যতম হিসেবে ভারত আজ একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
তবে শেয়ারবাজারের গুরুত্ব শুধু শেয়ার কেনাবেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভারতের অর্থনীতিরও অন্যতম চালিকাশক্তি। কোনো সংস্থা যখন IPO বা নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করে, তখন সেই অর্থ নতুন কারখানা নির্মাণ, গবেষণা, প্রযুক্তির উন্নয়ন, অবকাঠামো গড়ে তোলা, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে বিনিয়োগ করা হয়। অর্থাৎ শেয়ারবাজার দেশের শিল্প ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনের অন্যতম প্রধান উৎস। একই সঙ্গে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ভারতের অর্থনীতিতে বিপুল মূলধন নিয়ে আসে। সফল সংস্থাগুলি আরও বড় হয়, নতুন উদ্যোক্তারা ব্যবসা শুরু করার সুযোগ পান, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, সরকারের কর আদায় বাড়ে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও শক্তিশালী হয়।
বর্তমানে ভারতের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির সম্মিলিত Market Capitalization বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও এটি ভারতের অর্থনীতির প্রতি আস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রতীক।
ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে—মুম্বইয়ের একটি বটগাছের নীচে কয়েকজন ব্যবসায়ীর মুখে মুখে দর হাঁকার মাধ্যমে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজারে পৌঁছেছে। কয়েক সেকেন্ডে মোবাইল ফোনে একটি শেয়ার কেনা বা বিক্রি করার যে সুবিধা আমরা আজ স্বাভাবিক বলে মনে করি, তার পেছনে রয়েছে দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সংস্কার এবং অসংখ্য মানুষের অবদান।
ভারতের শেয়ারবাজারের ইতিহাস তাই শুধু অর্থের ইতিহাস নয়—এটি দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক অংশগ্রহণেরও এক অনন্য ইতিহাস।
©পার্থ