03/10/2026
"বিশ্বের যা কিছু সৃষ্টি,চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার সৃজিয়াছে নারী,অর্ধেক তার নর।"
সমগ্র ছোটনাগপুরের পরতে পরতে যেসব পরব পার্বণের গন্ধ মিশে আছে একান্ত গ্রাম্যতায়, তাদেরই একটি হলো জিতিয়া /জিতা /জিতুয়া পরব (উৎসব)। এটি মূলত কৃষিভিত্তিক একটি পার্বণ সাধারণভাবে, কৃষি ও ফসলের প্রকৃত দেবতা প্রকৃতি, তাই তাঁকে তুষ্ট করার জন্য এই উৎসব। জিতিয়া বাংলার গ্রাম সংস্কৃতির এক স্বল্পালোকিত দিক। লুপ্তপ্রায় প্রাচীন প্রথাগুলি কীভাবে একইসাথে সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের সমন্বয় তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো জিতিয়া পরব। যেহেতু এই উৎসব তথাকথিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর, তাই এর বাঁধাধরা কোনও শাস্ত্রসম্মত ছক নেই, লাগেনা কোনও পুরোহিতও। আর সেকারণেই স্থানভেদে এর সামান্য ভিন্নতাও লক্ষ্য করা যায়।
করম পরব দ্বারা আদিবাসী সমাজ যেমন জীব সৃষ্টি সূচনা, পরিচর্যা এবং বোনের দ্বারা ভাইয়ের স্বাস্থ্য, সম্পদ ও সুরক্ষার কামনা দর্শায়, তেমনি জিতা / জিতিয়া / জিতুয়া সন্তান প্রাপ্তি , সন্তানের ও স্বামীর দীর্ঘায়ু পরিপূর্ণতা কামনার কঠিন উপবাসের পরব। "জিতিআ" শব্দের অর্থ হলো, এক কথায় "জয়ী হওয়া" অর্থাৎ জিতিআ পরবের নেগ,নিতি একটু বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে যে,জিতিআ পরব হচ্ছে প্রকৃতি মায়ের উপাসনা করার পরব।তাই প্রতীকী হিসেবে বট বৃক্ষও আখের পূজা করা হয়ে থাকে এবং সন্তান রুপে শশাকে ব্যাবহার করেন। আঁখ গাছের ডাল গেড়ে বিশেষ সম্মান জানিয়ে পূজা করে থাকে। তাঁদের ধরনা সন্তানেরা যেন আঁখ মতো পুষ্টিগুণে ভরপুর, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ও তাঁর জীবনের বুদ্ধিমত্তার সৃষ্টিশীলতা আমরত্ব লাভ করে এবং সে বটবৃক্ষের মতো দীর্ঘজীবী ও সহনশীলতার প্রতীক হোক। আর এই সময় মায়েরা তাঁদের মাতৃকূল,পিতৃকূল এবং সসুর বাড়ির পূর্বপুরুষের স্মরণ করে থাকে।
এই পরব, মূলত খেটেখাওয়া মানুষের ক্লান্ত জীবনযাত্রায় বৈচিত্রের রসদ হলেও এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে এক সুন্দর বৈজ্ঞানিক যুক্তি। এই পার্বণে ব্যবহৃত, তার প্রত্যেকটিই সাধারণ জীবনযাপনের নিত্যপ্রয়োজনীয় রসদ। এই অনুষ্ঠানে এই ভোজ্য ফসলগুলির বীজ বপন করে দেখা হয় আগামী মরসুমে এগুলি ফসল উৎপাদনের উপযোগী কি না। অর্থাৎ প্রাসঙ্গকতর নিরীখে এটা বলা যায় যে প্রাচীনকালে কৃষি সভ্যতার বিকাশে নারীর অবদান উল্লেখযোগ্য। নারীরা নিজেদের তৎকালীন সময়ে গবেষনাগার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এবং এই গবেষনায় বিষাক্ত ফলের ব্যবহারে অনেকে স্বেচ্ছায় মৃত্যুকেও আলিঙ্গন করেছেন। তারাই নির্বাচন করেছেন কোন শস্যটি ভোজ্য আর কোনটি ত্যাজ্য । এই পূজয় ব্যবহৃত সমস্ত গাছের ডাল, পাতা, দানাশস্য সবকটি প্রসাদ হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং সবকটিরই স্বতন্ত্র পুষ্টিগুন রয়েছে। পাতাগুলো কৃষিতে সাহায্যকারী সন্তানসম গবাদিপশুকে দেওয়া হয়। কারন কৃষিজীবী সমাজে গবাদি পশুরা বাঁদনায় বিশেষ মর্যাদায় পুজিত হন।
#অঙ্কুরিত_দানাশস্য
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় আমিষ মানুষ কাচা খেতো। আদিমানব কখনই রান্না করা খাবার খায়নি। আগুনের আবিষ্কার হওয়ার পূর্বে মানুষ কাচা ফলমূল, শাকপাতা, ইত্যাদি খেত এবং উদ্দাম উচ্ছল স্বাস্থ্য নিয়ে বনে জঙ্গলে হিংস্র পশুর আক্রমন প্রতিহত করে বাস করত। গবেষনায় দেখা গেছে রান্নাকরা খাবারের প্রতি পুরোপুরি নির্ভরশীল হলে শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিন, মিনারেল, এনজাইম এর ঘাটতি হবেই এবং শরীরের মেটাবোলসম (বিপাকীয়) কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়ে প্রথমে পেটের পীড়া এরপর পর্যায়ক্রমে নানা রোগের উৎপত্তি হয়।
শরীর তত্ত্ববিদরা হিসাব করে দেখেছেন প্রতিটি প্রাণী যে বয়সে সাবালকত্ব আসে তার অন্তত গড়ে ছয় গুন বেশী আয়ু পায় কিন্তু প্রাণী আট - দশগুন বেশী আয়ু লাভ করে। যেমন একটা ঘোড়া তিন বছর বয়সে সাবালক হয় কিন্তু বাঁচে ৩০ বছর। একটা গরু তিন বছর বয়সে পরিণতি লাভ করলেও বাচে ১৫/২০ বছর। সেই হিসাবে মানুষের সাবালকত্বের বয়স ২০ বছর হলে মানুষের আয়ুষ্কাল হওয়া উচিত একশত বিশ বছর কিন্তু মানুষ ৬০/৭০ বছর বয়সেই দেহত্যাগ করছে তাও আবার নীরোগ অবস্থায় নয়। তাঁদের মতে প্রধান আহারের মাঝে কাচা ফল খাওয়া বাড়ান যেতে পারে। এইভাবে ধীরে ধীরে রান্না খাবারের এক তৃতীয়াংশ কাচা খাবার যেমন ফলমূল শাকসবজি এবং অঙ্কুরিত শশ্য যোগ করলেই সুস্থ্য থাকা যাবে। কাচা খাবার যতই বাড়বে ততই ফিরে পাওয়া যাবে আদিম স্বাস্থ্য, শক্তি, আয়ু এবং সুখ-শান্তি।
#প্রতীকী_আঁখ
জিতিয়া পুজায় আঁখকে প্রতীকী রুপেসামনে পুজা হয়। আঁখের উৎপত্তি স্থল হলো রাঢ়ভূম তথা ছোটনাগপুর যা নবপলীয় যুগ থেকে চলে আসছে। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন আখ থেকে প্রথম গুড় তৈরী হয় এবং নৌপথে গুড়ের রপ্তানী হয়, তাই এই অঞ্চলকে গৌড় বঙ্গ নামে অবিহিত করা হয়। আজো আদিবাসীদের বিবাহে, পুজোর মিষ্টান্ন স্বরূপ গুড় ব্যবহার হয় । সর্বপ্রথম গুড় তৈরি হয়, তাই আদিবাসিরা “মিষ্টি” কে “গুড়িয়া” বলেন। এরপর যথাক্রমে মিছরি এবং পরে চিনির অবিষ্কার। আগে বেড়া তৈরি হতো আঁখ দিয়ে তাই বেড়ার প্রবেশদারকে “আঁখদুয়ার” আজো বলেন। বাংলা থেকে চিনি আরবরা নিয়েছে। তাদের কাছ থেকে ইওরোপিয়ানরা। প্রথম ক্রুসেডের আগে ইওরোপিয়ানরা কখনো চিনির স্বাদ পায় নি।
এবার আসি শুধু আঁখ কে কেন চয়ন করেন?আমরা সবাই অবগত আঁখের উপকারিতা বিষয়ে তবু একটু চোখ রাখি। নির্জলা উপবাসের দরুন সবাই শারিরীক ভাবে দুর্বল না হয়ে পড়ে তাই পুজো শেষে আঁখ উপবাসীরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করেন।
১) নিঃশ্বাসের দুর্গন্ধ ও দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধ করে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের মত খনিজ উপাদান থাকে যা দাঁতের এনামেল গঠনে সাহায্য করে।
২) ইনস্ট্যান্ট এনার্জি ডিহাইড্রেশনে অব্যর্থ। আঁখের রস তাৎক্ষণিক শক্তির সঞ্চয় ও তৃষ্ণা নিবারণের খুব ভালো উৎস। আছে পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্লুকোজ। এই গ্লুকোজ মুহূর্তেই মানব দেহ রিহাইড্রেট করে চাঙা করে তোলে।
৩) নিরাপদ গর্ভধারণ নিশ্চিত করে :
আখের রস গর্ভধারণে সাহায্য ও নিরাপদ গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করে। আখের রসে প্রচুর ফলিক এসিড বা ভিটামিন বি ৯ থাকে যা স্পিনা বিফিডা এর মত জন্মগত ত্রুটি থেকে সুরক্ষা দেয়। এছাড়াও গবেষণায় জানা হয় যে, নারীর ডিম্বস্ফুটনের সমস্যা কমায় এবং গর্ভধারণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে।
৪) লিভারের সমস্যা দূর করেঃ
আখের রসে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সংক্রমণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং ইমিউন সিস্টেমকে উন্নত করে।আখের রস ক্ষারীয় প্রকৃতির হওয়ায় শরীরের ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্য রক্ষা করায় সাহায্য করে। এগুলো ছাড়াও হজম সংক্রান্ত সমস্যা, ডায়বেটিস,ফেব্রাইল ডিজঅর্ডার, ক্যান্সার , কিডনি, হাড় ও দাঁত সংক্রান্ত সমস্ত সমস্যায় অগ্রনীভুমিকা পালন করে আখ।
আর নির্জলা উপবাসের গুরুত্ব সবাই জানেন, নতুন করে বলার কিছুই নেই।
আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞান বা দর্শন উপবাস সম্বেন্ধ কি বলে দেখা যাক্ । পৃথিবীর খ্যাতনামা দার্শনিক ছিলেন সক্রেটিস, প্লেটো, পিথাগোরাস। ইতিহাস বলে, দর্শন লেখার আগে তারা নাকি উপবাস করতেন ।তাঁরা জানতেন যে উপবাস করলে তাদের মানসিক শক্তি বাড়বে ও এতে তাঁরা দর্শনের গুঢ় তত্ত্ব আহরণ করতে পারেন । চিকিৎসা বিজ্ঞান এত বলে যে ,উপবাস করলে আমাদের পাকস্থলী, হার্ট, ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্র, কিডনী, ধমনী, অগ্ন্যাশয় ও যকৃৎ বিশ্রামপায় ও মজবুত হয়। যাদের রক্ত খুবই গরম ওদের ক্রোধ বৃত্তি বেশী হয়। কাম-লালসা, ঈর্ষা ও লোভ এই বৃত্তি গুলিকে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় । যাঁদের পরিপাক যন্ত্র দুর্বল অর্থাৎ পাকস্থলী, যকৃৎ ও ক্ষুদ্রান্ত্র ও বৃহদান্ত্র ইত্যাদি উপবাসের পর এরা দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে ।
আর এই জিতা/ জিতুয়া/ জিতিয়া উৎসব নতুন ফসলের আবাহনেরও উৎসব। রুখা শুখা মাটিতে সবুজ ফসলের আশায় এই উৎসবের আয়োজন। নতুন পোশাক পরে তাঁরা নাচে-গানে মেতে ওঠেন। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিধারায় নতুন শাড়ি, মিশকালো চুলের খোঁপায় হলুদ ঝিঙফুলের আভাস, কিশোরী কোমর দুলে ওঠে, পায়ের চলন সামনে পিছনে হয়, মাদলের একটানা দ্রিমি-দ্রিমি প্রতিধ্বনির অনুরণনে গেয়ে ওঠে লুপ্তপ্রায় জিতিয়া গান। যে গানে লুকিয়ে আছে নারী সমাজের প্রাত্যহিক জীবনচর্চার বেদনামধুর বর্ণনা।
লেখনী : মৃন্ময় মাহাত।
ব্যাকগ্রাউন্ড ছবি : সুদীপ পাত্র।