05/27/2026
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটির নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সংস্থা ইউএসসিআইএস। ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অধিকাংশ বিদেশি নাগরিক এখন আর সহজে দেশটির ভেতরে বসে গ্রিনকার্ড বা স্থায়ী বসবাসের আবেদন সম্পন্ন করতে
পারবেন না। তাদের নিজ দেশে ফিরে মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটের মাধ্যমে আবেদন প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।
এই আকস্মিক ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে লাখ লাখ অভিবাসী, ইমিগ্রেশন আইনজীবী এবং অধিকারকর্মীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে চালু থাকা ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস’ পদ্ধতিকে সীমিত করার এই সিদ্ধান্তে অভিবাসীরা শঙ্কিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন দর্শনেই বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। নতুন নীতিতে ইউএসসিআইএস বলেছে, যারা পর্যটক, শিক্ষার্থী বা অস্থায়ী কর্মী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে আসেন, তাদের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নির্দিষ্ট সময় শেষে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। অস্থায়ী ভিসাকে গ্রিনকার্ড পাওয়ার ‘প্রথম ধাপ’ হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করতেই এই কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
ইউএসসিআইএসের মুখপাত্র জ্যাক কোহলার বলেন, ‘আমরা আইনের মূল উদ্দেশ্যে ফিরে যাচ্ছি। এখন থেকে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া অস্থায়ী ভিসাধারীদের নিজ দেশে ফিরে গ্রিনকার্ডের আবেদন করতে হবে।’
বিশ্লেষকদের মতে, এই নীতির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন মার্কিন নাগরিককে বিয়ে করা বিদেশি নাগরিক, শিক্ষার্থী ভিসাধারী, এইচ-১বি কর্মী ভিসাধারী পেশাজীবী, ধর্মীয় কর্মী এবং মানবিক সুরক্ষার আবেদনকারীরা। প্রতিবছর প্রায় ছয় লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে বসেই গ্রিনকার্ডের আবেদন করেন। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে তাদের বড় অংশকে বিদেশে গিয়ে দীর্ঘ ও জটিল কনস্যুলার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে। নতুন নির্দেশনায় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘পূর্বপরিকল্পিত অভিবাসন উদ্দেশ্য’কে। অর্থাৎ কেউ যদি পর্যটক বা শিক্ষার্থী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসে শুরু থেকেই স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা করে থাকেন, তাহলে সেটি নেতিবাচকভাবে দেখা হবে। বিশেষ করে, ট্যুরিস্ট ভিসায় এসে দ্রুত বিয়ে করে গ্রিনকার্ডের আবেদন করলে আরও কঠোর যাচাইয়ের মুখে পড়তে হতে পারে। এ ছাড়া ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়গুলোও এখন আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। অনুমতি ছাড়া কাজ করা, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবস্থান করা বা ভিসার শর্ত ভঙ্গ করলে আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
ইউএসসিআইএস স্পষ্ট করেছে, গ্রিনকার্ড পাওয়া কোনো অধিকার নয়; এটি প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয়। ফলে আইনগত যোগ্যতা পূরণ করলেও আবেদন অনুমোদন নিশ্চিত নয়। কর্মকর্তারা কেসভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেবেন এবং কেবল ‘অসাধারণ পরিস্থিতিতে’ যুক্তরাষ্ট্রে থেকেই স্ট্যাটাস পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তবে ‘অসাধারণ পরিস্থিতি’ কী, সেটি এখনো স্পষ্ট করেনি প্রশাসন।
সাবেক বাইডেন প্রশাসনের ইউএসসিআইএস উপদেষ্টা ডগ র্যান্ড এই নীতির সমালোচনা করে বলেন, ‘এই প্রশাসনের লক্ষ্য হচ্ছে যত কম মানুষ সম্ভব স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পাক। কারণ গ্রিনকার্ড নাগরিকত্বের পথ খুলে দেয়।’
অন্যদিকে আমেরিকান ইমিগ্রেশন ল’ইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত কয়েক দশক ধরে চালু থাকা আইনি প্রক্রিয়াকে কার্যত উল্টে দিতে পারে। তাদের আশঙ্কা, বিদেশে মার্কিন কনস্যুলেটগুলোতে ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে অনেক সময় এক বছরের বেশি লেগে যায়। ফলে আবেদনকারীদের দীর্ঘ সময় পরিবার, চাকরি ও শিক্ষাজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হতে পারে।
মানবিক দিক থেকেও উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত বা অস্থিতিশীল দেশের নাগরিকদের জন্য এই নীতি বড় সংকট তৈরি করবে। উদাহরণ হিসেবে আফগানিস্তানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে মার্কিন দূতাবাস কার্যত বন্ধ। ফলে আফগান নাগরিকেরা কোথায় গিয়ে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
অভিবাসন আইনজীবীরা মনে করছেন, এই নীতি আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কারণ ‘অ্যাডজাস্টমেন্ট অব স্ট্যাটাস’ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে স্বীকৃত একটি প্রক্রিয়া। সেটিকে সীমিত করার উদ্যোগ ভবিষ্যতে বড় বিতর্ক তৈরি করতে পারে।