01/03/2024
কিছু মানুষের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে হয়তো আল্লাহ আমাদের অবস্থান সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করেন যে, আল্লাহ আমাদেরকে কত ভালো রেখেছেন কিছু মানুষের থেকে।
__________________________________________
ঘড়ির কাটা সময়ের দুপুর দুইটা ছুই ছুই। আপু আর আম্মু ডাক্তারের চেম্বারে, আপুকে থাইরয়েডের ডাক্তার দেখাচ্ছিলো। ল্যাবএইড হস্পিটালের ৫ম তলায় দেওয়াল গ্লাস লাগলো, গ্লাস দিয়ে নিচের রাস্তাগুলো দেখা যাচ্ছিলো। সেটাতে মাথা ঠেকিয়ে ব্যাস্ত রাস্তা আর রাস্তার ব্যাস্ত পথিকদের দিকে তাকিয়ে আছি আমি। পথে চলা কত গাড়ি গাড়ির ভিতর কত মানুষ।সবাই নিজ নিজ কাজে ব্যাস্ত।
আর আমি ভাবছিলাম সকালে আমাকে পর্যবেক্ষণ করে ডাক্তারের বলা কথাগুলো। আমার নাকি ফুসফুসের মধ্যে ছিদ্র রয়েছে তা অপারেশনের মাধ্যমে ঠিক করতে হবে। যদিও সেটা ১১ বছর বয়সেই জানতে পেরেছিলাম। কিন্তু আজকে ডাক্তারের বলার ভাব মুর্তিটা ভিন্ন ছিলো। সুন্দর করে প্যাডের একটা কোণায় লিখে দিলো হাই-রিক্স এবং এটাও জানিয়ে দিলো পিছনে ফিরার কোনো সুযোগ নেই। সুস্থ জীবন পেতে চাইলে করতেই হবে।
এসবিই ভাবছিলাম। ভয় আর অগাত চিন্তারা বার বার হানা দিচ্ছে হৃদয়ের মধ্যে। কিছুটা সময়ের জন্য মনে হলো পৃথিবী হয়তো এখানেই থমকে গেছে। চোখ গুলো কেমন ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর। হটাৎ অনুভব করি চোখের জলগুলো বাধ অমান্য করে গড়িয়ে পড়লো। কেউ দেখার আগে মুছে নিলাম। কিন্তু মনে হলো দুইটা চোখ দেখে ফেলেছে।
হটাৎ খেয়াল করলাম অপর পাশ থেকে একজন লোক আমার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ তাকে পর্যবেক্ষণ করলাম। আমার মতোই পাঞ্জাবি টুপি গায়ে মাথায়। আমি তার দিকে তাকাতেই সে উঠে এসে আমার পাশে বসে। আমাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো কেমন আছি? আমি সালামের উত্তর দিয়ে বললাম আলহামদুলিল্লাহ ভালো আপনি কেমন আছেন। সে জবাব দিলো আল্লাহ যেমন রেখেছেন আলহামদুলিল্লাহ।
তারপর বললো ছোট ভাই কিছু মনে না করলে কিছুক্ষণ আগে কান্না করতে দেখলাম, কি হয়েছে? কান্না করার কারণ জানতে পারি? আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর সবটা খুলে বললাম। সবটা শুনে তিনি বললেন, ধৈর্য ধরুন। আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।
মুমিনদের আবার কিসের ভয়? দুনিয়া তো কিছু সময়ের জন্য মাত্র। তারপর দুজনই চুপ। কিছুক্ষণ দুজন দুজনকে পরক্ষ করছিলাম। দেখতে মাশাল্লাহ সুন্দর সুদর্শন। জামাকাপড় দেখে মনে হলো পরিবারের অবস্থা বেশি উন্নত না। চলে কোনো রকম। মধ্যে ভিত্তের আবাসও পাওয়া যায়।
আমাকে চুপ থাকতে দেখে তিনিই বললেন। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে মাদ্রাসায় পড়ো! নিয়মিত নামাজ পড়তো? আমি জবাব দিলাম জি আমি মাদ্রাসায় পড়ি। নামাজ পড়তে চেষ্টা করি নিয়মিত। তবে মাঝে মাঝে মিস হয়।
তিনি বললেন তাহলে আর কিসের ভয়? নিয়মিত নামাজ পড়ে দোয়া করো। আল্লাহর বান্দা। আল্লাহ দোয়া কবুল করলে সুস্থ হয়ে যাবে। মারা গেলে চিরো সুখের জান্নাত লাভ করবে। উত্তরে বললাম জি ভাই দোয়া করবেন।
আম্মু আর আপুকে চেম্বার থেকে বের হতে দেখা গেলো। ভাইটার থেকে বিদায় নিয়ে তাদের পাশে এসে দাড়ালাম। আসার সময় উনি পিছনে থেকে বললেন একদম চিন্তা করো না। আল্লাহ সব ঠিক করে দিবেন। ফিরিয়ে আর উত্তর দিইনি। কেননা ততক্ষণে তার থেকে মোটামুটি দূরে চলে আসছিলাম। শুধু তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলাম।
আপুর ডাকে তার দিকে ফিরলাম। প্রশ্ন করলো, কিরে কি করছিলি? ভাইটার দিকে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে বললাম। উনার সাথে কথা বলছিলাম। তা শুনি আপু আবার জিজ্ঞেস করলো কি বলছিলো উনি? আমি কিছু বলার আগেই আপু বললো, আচ্ছা এখন বলতে হবে না গাড়িতে উঠ পরে বলিস।
তাই চুপচাপ হেটে এসে আপু আম্মুর সাথে গাড়িতে উঠে বসলাম। তারপর আপু বললো এবার বল তোরা কি কথা বলছিলি? আপু আর আম্মুকে আমাদের মাঝে হওয়া সব কথা বললাম। আপু আমার কথা শুনে আশ্চর্য হলো। কিন্তু কেনো সেটা বুঝতে পারছিলাম না।
আপুকে জিজ্ঞেস করলাম, কিরে এমন শকড খাওয়ার মতো অবস্থা কেনো? আপু উত্তর দিলো, উনি এখানে কেনো এসেছে জানোস? আমি বললাম নাতো। জিজ্ঞেস করিনি। তারপর আপু যেটা বললো সেটার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না আমি।
আপু বললো উনার ১৫দিন পরে অপারেশন। ২টা কিডনিই পুরো ডেমেজ। ২০০% এর মধ্যে ০০% ভালো। তার মা তাকে একটা কিডনি ডোনেট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই আজকে তার মায়ের কিডনি দেওয়া যাবে কিনা তা পরিক্ষা করাতে আসছে।
পাশে থাকা পানির বোতলটা খুঁজে এক নিশ্বাসে অনেকটা পানি খেলাম। আপু বললো কিরে কি হয়েছে? এমন করতেসোস কেনো? কোনো সমুস্যা? আমি হাত দিয়ে ইশারা করে বললাম, আমি ঠিক আছি।
কিছুক্ষণ পরে একটা দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বললাম, এতো বড় সমুস্যাতেও উনি এতোটা স্বাভাবিক কেমন করে আছেন? আল্লাহর কসম যতটা সময় আমার সাথে কথা বলেছে, এবং আমি যতটা সময় উনাকে দেখেছি। একটা মুহুর্তের জন্যও উনার মুখ থেকে হাসি হাসি ভাবটা সরে নাই।
তারপর আপু বললো হুম উনি কোরআনের হাফেজ, কোনো এক মাদ্রাসায় পড়াতেন। হটাৎ শরীরে পানি চলে আসে। আর পরিক্ষা করে জানতে পারে তার অবস্থা এতো সিরিয়াস। তার মা তাকে কিডনি ডোনেশন করবে। কিন্তু সে নারাজ। শেষ মেষ মায়ের জোড়াজুড়িতে বাধ্য হলো।
তারপর বললাম আর নিতে পারছি না চুপ থাকেন।
সবাই চুপচাপ বসে রইলাম। গাড়ি চলছে নিজ গতিতে আপন ঠিকানার উদ্দেশ্যে।
নিজের মনের থাকা সকল আক্ষেপ সব নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ আমাকে কত ভালো রেখেছেন।
__________________________________________
এটাকে মোটেও গল্প ভাববেন না।
বাস্তব ঘটেছে আমার সাথে।
__________________________________________
খুব শীগ্রই আমার অপারেশন করানো হবে। সকলের কাছে দোয়ার দরখাস্ত।
__________________________________________
শিক্ষনীয়: কখনোই নিজের অবস্থান নিয়ে অভিযোগ করবেন না। পৃথিবীতে অনেক মানুষ আপনার স্থানে পোছাটাকে তাদের স্বপ্ন মনে করে।
__________________________________________
যে অবস্থাতেই থাকেন একবার বলেন আলহামদুলিল্লাহ।
________________ধন্যবাদ ___________________